History of dakshin dinajpur, bangla bible, DAKSHIN DINAJPUR, Uttar DINAJPUR, Malda, chiristanity, santhal,indian tribe,mahli tribe, unknown facts, tourist place of Malda, tourist place of Dakshin DINAJPUR ,bible, bible story, bible story in bangla,dakshin dinajpur news,adibashi,sautal,indian tribe culture,

TRANSLATE ARTICLE TO YOUR LANGUEGE

বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

ডাইনী হত্যা আদিবাসী দলিত সমাজের অভিশাপ || dayan witch hunting in indian country

টান-টান উত্তেজনা, চোখের নিমেষে অপূৰ্ব নারি অবয়ব থেকে ভয়ংকর রুপে পরিবর্তন, আবার নিমেষেই শূন্যে ধোঁয়ার মত বিলিন, চলচ্চিত্রের এমন সব অশুভ আত্মার আর ডাইনী শিকারকারি ভেন হেলসিং অথবা অন্যসকল চরিত্র দর্শকদের দূরদর্শনের সামনে বেঁধে রাখে, শিশু মনে এই সকল চরিত্রগুলো নায়ক হিসাবে ঘর করে ফেলে আরো দ্রত। কিন্তু পার্থিব জগৎে "ডাইনী হত্যা" করুণার উদ্বেগ ঘটাই, কেনোনা চলচ্চিত্র আর পার্থিব জগৎ পার্থক্য বিস্তর। 

ডাইনী-হত্যা-আদিবাসী-দলিত-সমাজের-অভিশাপ
ডাইনি হত্যা ও আদিবাসী সমাজ


ডাইনী হত্যার আন্তর্জাতীক প্রেক্ষাপট

হাঙ্গেরীর ডাইনী রানি এলিজাবেথ বেথুনির কাহিনী আজো স্তম্ভিত করে আসছে হাঙ্গেরীর দেশবাসীদের, কিভাবে তার রাজত্বের দিনে নিজের সৌন্দর্যকে অক্ষুন্য রাখার তাগিদে একের পর এক,বহু যুবতীর রক্তে স্নান আর রক্ত পান করতেন এই মহান রানী, হাঙ্গেরীর জনগনের চোখে ঘটনাটি প্রকাশ পেলে, রানির কারাবাস ও মৃত্য হয়, কিন্তু রানীর মৃতদেহের অন্তর্ধান রহস্য এখনো অমীমাংসিত, যা বাস্তবিক ভাবে ডাইনীবিদ্যার অবস্থানকে জোরালো করেছিল। যাকে ঘিরে হলিয়ুডেও বানানো হয়েছে বহু চলচ্চিত্র। অন্যদিকে ইউরোপীয়ান শাষন ব্যবস্থায় খ্রীষ্টান ধর্মের অভূতপুৰ্ব উত্থান ইউরোপের মসনদে চার্চের অবস্থান শক্তিশালী করে তুলেছিল, তাই পেগান ধর্মের সাথে খ্রীষ্ট ধর্মের বাদানুবাদে অসংখ্য নারীরা চার্চ ব্যবস্থার দ্বারা ডাইনী তকমা পেয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়েছে, যে মৃত্যুদন্ডের ধরন ছিল মারাত্মক পৈশাচিক। সেই পর্বে ইউরোপে তিনশ বছরের চার্চ রাজত্বে অন্তত ৩০ লাখ নারী ডাইনী হিসেবে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো, যার মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল ৬০ হাজার নারীদের, এমনকি ১৪৮৭ সালে  জার্মান পাদ্রী ‘মালিয়ুস মালফিকারুম’ ‘ডাইনিদের শায়েস্তা করার হাতুড়ি’ নামের একটি বইয়ো লিখেছিলেন।
ভারতীয় প্রেক্ষাপট
কিন্তু দীর্ঘসময় ও দূরত্বের পরিসীমা ছাড়িয়ে ভারতের অন্দর মহলে এই কুখ্যাত বিশ্বাস কি করে ঘর করেছে তা কল্পনার অতিত। শুধু যে ভারতেই এমন জঘন্য অন্ধবিশ্বাসের বেড়াজাল রয়েছে এমনটিও নই, তাই বিশ্বব্যাপী এই অন্ধবিশ্বাসের গোঁড়াই আঘাত হানতে প্রতিবছর ১০ আগস্ট বিশ্ব ডাইনি হত্যাবিরোধী দিবস হিসাবে পালিত হয়। ইউরোপে যদিও ধর্মিয় গোঁড়ামী ডাইনী অপবাদ জনিত হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী, কিন্তু ভারতে সে ক্ষেত্রে নিরক্ষরতা ও অত্যাধিক অন্ধবিশ্বাস এর পিছনে দায়ী।
আরো পড়ুন-রামরাজত্ব ও আদিবাসী দলিত সমাজ।। রাম রাজত্ব আমার দরকার নেই।

যাইহোক, আমাদের ভারতে ডাইনি আপবাদে নারি হত্যা বিগত দশকে দৈনন্দিন ঘটনা প্রবাহ হয়ে উঠেছিল, যার শিংহভাগ সংগঠিত হত আদিবাসী সমাজ সাঁওতাল, মাহালী, ওড়াঁও, মুন্ডা , বোড়ো এর মাঝে , আবার তার শিংহভাগ মহিলারাই ছিলেন বৃদ্ধা। ভারতের বিহার, ঝাড়খন্ড, আসাম, রাজস্থান, উড়িষ্যা, উত্তরপ্রদেশ এমনকি আমাদের বাংলার উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিনবঙ্গ উভয় এলাকাতেই এর অভিশাপ দেখা যায়। বিগত দশকে ভারতের কিছু কিছু রাজ্যের ,যেমন - উড়িষ্যা, ঝারখণ্ড, বিহার, ছত্তিশগড় রাজ্যে ডাইনী হত্যার কলঙ্ক এতটাই জঘন্য ছিল যে, এই সমস্ত রাজ্যের সরকার একপ্রকার বাধ্য হয়েই ডাইনী হত্যা বিরোধী আইন পাশ করে। যেই রাজ্যে তালিকাই সর্বশেষ সংযোজন ২০০৫ সালে আসাম রাজ্যে “Assam Witch Hunting (Prohibition, Prevention and Protection) Act, 2015”
ভারতে ডাইনী হত্যা
ভারতে ঘটে যাওয়া ডাইনী হত্যার উপরে অনেক পরিসংখ্যান করা হয়েছে, যা ভারতীয়দের মাঝে বিশেষত আদিবাসীদের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস ও শিক্ষার অভাবের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে বারং বার। ডিস্কভারী চেনেল এই বিষয়ে বিশেষ তথ্যচিত্র তুলে ধরেছিলেন, যেখানে পরিষ্কার হয়ে উঠে আদিবাসী সমাজে ডাইনী মান্যতার কঠোর বিশ্বাস, সেই তথ্যচিত্রে আদিবাসী এক মায়ের কান্না বলে উঠেছিল আমার সন্তানি আমাকে মেরে ফেলতে ছুটে আসে ডাইনী অপবাদ নিয়ে।
ভারতের বিহার, ঝাড়খন্ড, আসাম, রাজস্থান, উড়িষ্যা, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ডাইনী জনিত হত্যাকান্ড প্রচুর। ভারতের একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে ১৯৯৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ডাইনি সন্দেহে হত্যার ঘটনা ঘটেছে আড়াই হাজার। পশ্চিমবঙ্গ অধ্যূষিত দক্ষিনবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ও দুই পরগনায় আবার উত্তরবঙ্গের মালদাতে বহুল ডাইনি হত্যার নজীর উঠে এসেছে, এই সমস্ত স্থানের বেশীর ভাগ ডাইনী অপবাদ আদিবাসী সাঁওতাল মহিলাদের উপর উঠে এসেছে, আবার উত্তরবঙ্গের চা বাগান এলাকার আদিবাসীদের মাঝেও এমন ঘটনা উঠে এসেছে ক্রমাগত।
আরো পড়ুন-ভারতীয় আদিবাসী উপজাতিদের বিভন্ন চিত্রকলা ও শিল্প। ১ম পর্ব।
যার কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা তুলে ধরা বাঞ্চনীয়, যার মধ্যে অন্যতম হল ঝাড়খণ্ডের রাঁচির মাণ্ডরে গ্রামে একরাতেই পাঁচ মহিলাকে পিটিয়ে খুন করা হয় ডাইনি অপবাদে। গোটা ঘটনার দেশব্যাপি তীব্র নিন্দার ঝড় বয়ে গেলে, সেই এলাকাই সচেতনতা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন সংগঠন ঝাঁপিয়ে পরেছিল, কিন্তু সেই সচেতনতা শিবিরের উপরে গ্রামবাসীরা নিজের ক্ষোপ উগরে দেই, যাই হোক এতে পরে হতাহত হয়নি।
একই ভাবে উড়িষ্যা সুন্দরঘর জেলার একটি আদিবাসী গ্রামে ক্রমাগত মরতে থাকা গৃহপালিত পশুর অকাল মৃত্যুর পিছনে জানগুরু মাংরি নামের এক আদিবাসী মহিলাকে  ডাইনি অপবাদ দিলে, গ্রামের লোকেরা গভীর রাতে  ঘুমন্ত অবস্থায়  মাংরি সহ মাংরির দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে পিটিয়ে মেরে ফেলে দেই।

ডাইনি-হত্যা-আদিবাসী-দলিত-জানগুরু
কল্পনার ডাইনী

ডাইনি হত্যার নিষ্ঠুরতা চড়ম রুপ প্রায় গোটা ভারতেই লক্ষ্য করা গেছে, ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর’ তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ভারতে আড়াই হাজার নারীকে ডাইনি অপবাদে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। যার মধ্যে একটি জঘন্যতম ঘটনা উঠে আসে ভারতের রাজস্থানের আজমীর জেলা থেকে। আজমীর জেলার দেবী রায়গার নামের এক বিধবা মহিলাকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে প্রথমে তাকে উলঙ্গ করে গোবর খাওয়ানো হয়, তারপর চোখের ভেতর গরম লোহা ঢুকিয়ে এবং এবং শেষে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার কথাটি ভাবলেই কেমল যেন গা শিরশির করে উঠে। কিন্তু এই ঘটনার নগ্ন দিকটি হল যারা এই নরকীয় কান্ড ঘটিয়েছিল তাদের বেশিরভাগ ছিল অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে, নারি হয়ে নারির প্রতি এই হিংস্রতা বাস্তবেই অত্যন্ত নিন্দনীয়।
ডাইনী হত্যার কারন
ডাইনী অপবাদে হত্যা সামাজিক ব্যাধি ছাড়া কিছু নই, যে ব্যাধি বিগত দশকের আগ পর্যন্ত শিকড় গেড়ে রেখেছিল আদিবাসী সমাজে। যার পিছনে প্রধান দায়ী নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতা। একুশ শতকের দোড়গোড়াই অবস্থান করেও আদিবাসীদের মাঝে ডাইনী-বিদ্যা জনিত বিশ্বাস জায়গা করে রয়েছে এখনো। এখনো প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামে গেলে শোনা যাবে ডাইনীদের রুপক কাহিনী, ডাইনিরা গৃহপালিত পশুকে চোখের নিমেষে ভক্ষণ করে, রাত্রে করে জীভে লন্ঠন জ্বালিয়ে উড়ে বেড়াই, শিশুদের আত্মা বাইরে থেকেই খেতে পারে, এমনকি ডাইনীরা শরিরের বাইরে থেকেই মানব শরিরের অভ্যন্তরীন পরিকাঠামো লক্ষ্য করতে পারেন, এমন গাঁজাখুড়ি গল্পের সাথে কিছু পরিচিত ডাইনীর নামো পেয়ে যেতে পারেন, যা সেই ব্যাক্তি সকলের মানসিক বিকারতার প্রমান দেই।
কিন্তু অন্তর্নিহিত পরিসংখ্যান ঘটনাচক্রের  অন্য চিত্র তুলে ধরে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে, যারা ডাইনী অপবাদে জর্জরিত হয়েছে, তাদের অনেকেই মানসিক রোগি ছিল, এছাড়াও সব ডাইনী হত্যার অধিকাংশের পেছনে উঠে এসেছে জমি সংক্রান্ত বিবাদ, শত্রুতা অথবা আর্থিক বিবাদ। সুতরাং নিরক্ষরতার পাশাপাশি সামাজিক অনৈতিক পরিকাঠামোও এই সকল জঘন্য অপরাধের পিছনে সমান ভাবে দায়ী।
মুক্তির উপায়
যদিও ডাইনী অপবাদে হত্যালিলার ধারাবাহিকতা চড়ম ভাবে কমেছে, তবে ডাইনী-বিদ্যার উপর মানুষের বিশ্বাস বৃক্ষের মূল যতদিন না উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে ততদিন এটা থেকে নিষ্পত্তি পাওয়া মুশকিল। যার জন্যে চাই প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকাই সমাজ সচেতনতা মূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে যে প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকা থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব অনেক, ফলে শিক্ষার আলো ঠিক মত আলোকিত হয়ে উঠে না আদিবাসী গ্রাম গুলো, একইভাবে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর দূরত্ব গ্রামবাসীদের জানগুরুর শরনাপর্ণ হতে বাধ্য করছে ঘনঘন, এই বিষয়ে এটা স্বীকার্য, বেশী ভাগ প্রত্যন্ত এলাকার আদিবাসীদের মাঝে ডাক্তারি চিকিৎসা থেকে কবিরাজী আর জানগুরুর গ্রহনযোগ্যতা অনেক বেশী।
ডাইনি-হত্যা-আদিবাসী-দলিত-জানগুরু
এরা কি ডাইনী হতে পারে?

আবার এটাও নই যে বিভিন্ন সংগঠন বা সরকারি সংগঠন এই সামাজিক অবক্ষয়ের বিপক্ষে কাজ করেনি, উদাহরণ রয়েছে প্রচুর, মালদার বিখ্যাত গম্ভিরা গান, তার নৃত্যনাট্যে ডাইনী বিদ্যার বিরুদ্ধে প্রচার করে আসছে বহুকাল আগে থেকে, তেমনি বহু ব্যক্তি যেমন বীরুবালা রাভা ও দিব্যজ্যোতি শইকিয়া ডাইনি হত্যা রোধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। আসাম বিধান সভায় পাশ হয়ে যাওয়া “Assam Witch Hunting (Prohibition, Prevention and Protection) Act, 2015” আইনে ডাইনি অপবাদ কারি, হত্যাকারি এবং জানগুরুকেও এই নিয়মের আওতায় আনা হয়। আমার মনে হয় এমন আইন সংবিধান প্রদত্ত হলে এই বিষবৃক্ষের উৎপাটন আরো সহজ হবে।

সুমন্ত মাহালি হেমরম


WhatsApp

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন