Unique knowledge bangla

History of dakshin dinajpur, bangla bible, DAKSHIN DINAJPUR, Uttar DINAJPUR, Malda, chiristanity, santhal,indian tribe,mahli tribe, unknown facts, tourist place of Malda, tourist place of Dakshin DINAJPUR ,bible, bible story, bible story in bangla,dakshin dinajpur news,adibashi,sautal,indian tribe culture,

TRANSLATE ARTICLE TO YOUR LANGUEGE

বুধবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

শিলিগুড়ির ইতিহাস: কীভাবে একটি গ্রাম থেকে একটি মহানগর হয়ে উঠল।। History of Siliguri: How a Village Became a Metropolis।।

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৩

  শিলচাগুড়ি শিলিগুড়ি

শিলিগুড়ি শহরের ইতিহাস বেশ ঐতিহ্যবাহী ও রোমাঞ্চকর। তিস্তা, মহানন্দা, বালাসন, জলঢাকা নদী দ্বারা ঘিরে রাখা একটি সুন্দর শহর। পাহাড়ী নদী, সমতলীয় নদী শিলিগুড়িকে যেমন সৌন্দর্য প্রদান করেছে , তেমনি জীবনের রুপরেখা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা গ্রহন করেছে। বলাবাহুল্য পাহারের পদতলে থাকা শিলিগুড়ি একসময় নুড়িপাথরে ভরা জঙ্গলময় সমতল ভূমি ছিল। তাই এই অঞ্চলটি পূর্বে শিলচাগুড়ি নামে পরিচিত ছিল। যার অর্থ নুড়িপাথরের ঢিবি। এই শিলচাগুড়ি নামটি আজ শিলিগুড়ি নামে পরিচয় লাভ করেছে। নামটি কোন জাতিরা দিয়েছে তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। একটি মতামত হল যে, এই নামটি ভুটানিরা দিয়েছে। ভুটানিরা এই স্থানকে শিলচাগুড়ি বলতেন, যার অর্থ হল শিলা বা পাথরের গুড়ি। একটি অন্য মতামত হল যে, এই নামটি ব্রিটিশরা দিয়েছে।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

এই শহরটি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন রাজ্য, সংস্কৃতি ও বিপ্লবের সাক্ষী হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই এত মনোরম আবহাওয়া যুক্ত, সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ, উর্বর ভূমি সর্বপরি তিন দিক দিয়ে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান দেশের সাথে খুব সহজেই সংযোগ স্থাপন, উত্তর পূর্ব ভারতের প্রবেশের জন্য প্রবেশ পথ এছাড়াও আরো কয়েকটি দিক রয়েছে যার দরুন শিলিগুড়ি ভারত তথা বিশ্বের কিছু দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচয় পেয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই শিলিগুড়িকে দখলের চেষ্টা আগেও দেখা গিয়েছে এবং এখনো দেখা যাচ্ছে।

শিলিগুড়ির ইতিহাস: কীভাবে একটি গ্রাম থেকে একটি মহানগর হয়ে উঠল।। History of Siliguri: How a Village Became a Metropolis।।
সেবকের ঐতিহ্য বাহী করোনেশন ব্রিজ

পূর্বে সিকিম যখন ভারতের অংশ ছিল না তখন সিকিমের চোগিয়াল রাজা শিলিগুড়ি কে দখলে ছিল। এই সময় ১৭৭৫ সাল থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে  নেপাল থেকে বহু নেপালি সিকিমে প্রবেশ করতে শুরু করে যার তীব্র বিরোধিতা করে সিকিম সরকার। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশরা সিকিমের কাছে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং যার ফলে গোর্খা নেপালিরা হয়ে উঠে ব্রিটিশ এবং সিকিমের কমন শত্রু। নেপালিরা ইতিমধ্যে শিলিগুড়ির পার্শ্ববর্তী এলাকা দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ নেপাল যুদ্ধ হলে , নেপাল পরাজিত হয় এবং সৌগলির চুক্তি করে এবং দখলকৃত জায়গা শিলিগুড়িকে ফিরিয়ে দেই। ব্রিটিশদের ক্ষমতা এবং প্রভাব সিকিমের উপর দিন দিন বাড়ছিল। ব্রিটিশরা সুযোগ বুঝে একসময় তারা দার্জিলিং এ আধিপত্য বিস্তার করে। এতে শিলিগুড়ির দায়ভার চলে আসে ব্রিটিশ সরকারের হাতে। এই শিলিগুড়ি থেকে ব্রিটিশরা তাদের ব্যবসায়িক সামগ্রী পাহাড়গুলোতে রপ্তানি করতে শুরু করে।

রেলগাড়ি সংযোগ

ব্রিটিশরা প্রধানত শিতপ্রধান দেশের নাগরিক ছিল পাশাপাশি চায়ের চাহিদা ব্রিটেন সহ গোটা বিশ্বে বাড়ছিল। সুযোগ বুঝে শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশরা দার্জিলিং শহরকে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে তৈরি করে। যার ফলস্বরূপ দার্জিলিং যাতায়াত এবং চা পাতা পরিবহনের জন্য ব্রিটিশদের শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং প্রযন্ত রেল ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য করে ১৮৭৮ সালে এবং শিলিগুড়ি শহরটি গড়ে তোলা হয় শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন (একমাত্র হেরিটেজ রেলষ্টেশন)। এই ষ্টেশনে বহু বিখ্যাত ভারতীয় স্মৃতি বহন করে রেখেছে, যেমন - মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাঘা যতিন প্রমূখ। আবার ১৮৮০ সালে ন্যানো গ্যাজের রেলওয়ে ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা এখনও হিমালয়ান রেলওয়ের ট্রয় টেন হিসেবে বিখ্যাত, এবং এটিও বিশ্ব হেরিটেজ হিসাবে নথিভুক্ত।

শিলিগুড়ির ইতিহাস: কীভাবে একটি গ্রাম থেকে একটি মহানগর হয়ে উঠল।। History of Siliguri: How a Village Became a Metropolis।।
শিলিগুড়ি টয় ট্রেন 

 চিকেন নেক

ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাবার আগে ভারতের বৃহৎ ভূ-খন্ডকে ভারত এবং বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) হিসেবে সিরিল রেডক্লিভ শিলিগুড়ির উপর দিয়ে বয়ে চলে যাওয়া মহানন্দা নদী যেখানে বাংলাবান্ধা পার করেছে সেখান থেকে নদীর এপার ভারত এবং ওপার বাংলাদেশ হিসেবে ভাগ করেন। যার ফলে শিলিগুড়ির একপাশে নেপাল অন্যপাশে বাংলাদেশ থাকার ফলে উত্তর পূর্ব ভারতের সাথে সমগ্র ভারতের ভূ যোগাযোগের খুবই পাতলা সরু করিডোরের তৈরি হয়েছে, যেটি আজ শিলিগুড়ি চিকেন নেক করিডর হিসাবে পরিচিত। মূলতঃ যে কোনো দেশ এই স্থানটি দখল করলে ভারতের মূল ভূ-খন্ডের সাথে উত্তর পূর্ব ভারতের যোগাযোগ নষ্ট হতে পারে। সুতরাং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই করিডোরের গুরুত্ব অসীম।

আরো পড়ুন - বালুরঘাটের ইতিহাস: প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগের এক শহর।।

তবে এত কিছুর পরেও শিলিগুড়ির অগ্রগতিতে বাধা পরেনি। যার দরুন ১৯৯৪ সালে শিলিগুড়িতে মিউনিসিপাল কর্পোরেশন তৈরী করে ফেলে নগর সৌন্দর্যায়ন প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। 

রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

বালুরঘাটের ইতিহাস: প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগের এক শহর।। History of Balurghat: A City from Ancient to Modern Age।।

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৩

 বালুরঘাট দক্ষিণ দিনাজপুরের সদর, সময়ের উত্থান পতনের ইতিহাস বয়ে নিয়ে আজ একুশ শতকের আঙ্গিনায় পৌঁছে গেছে। বর্তমানে একুশটি ওয়ার্ড নিয়ে তৈরি বালুরঘাট পৌরসভা। এক সময়‌ পশ্চিম দিনাজপুরের অংশ হিসেবে বালুরঘাট শহর প্রতিষ্ঠিত থাকলেও পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে দক্ষিণ দিনাজপুর এবং উত্তর দিনাজপুর পৃথক ভাবে অস্তিত্বে এলে বালুরঘাট দক্ষিণ দিনাজপুরের সদর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

আত্রেয়ী নদীর তীরে গড়ে উঠা এই ছোট শহরে, আত্রেয়ী নদীর জলপ্রবাহের ধারার মতো বয়ে গেছে যুগের পর যুগ। প্রাচীন থেকে বর্তমান সবকিছু মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে এই শহরে।

 প্রাচীন যুগ

বালুরঘাটের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে ইতিহাসের ধারা, প্রাচীন যুগে মৌর্য, গুপ্ত, কুষাণ, শুঙ্গ সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বালুরঘাট ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন যুগে বালুরঘাট পুন্ড্রবর্ধন রাজ্যের অংশ ছিল। বেদে উল্লেখ একটি বিশেষ জাতির লোকেরা পুন্ড্রবর্ধন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিল। পুন্ড্রবর্ধনের অস্তিত্বে বালুরঘাটের ইতিহাস সম্পূর্ণ হবে না, যতক্ষন না বালুরঘাটের পার্শ্ববর্তী এলাকা বা দক্ষিণ দিনাজপুরের ইতিহাস যুক্ত‌ না করা হয়। হরষেন রচিত প্রাচীন গ্রন্থ বৃহৎ কথা কোষ‌ অনুযায়ী মৌর্য সাম্রাজ্যের স্থাপক চন্দ্রগুপ্ত পুন্ড্রবর্ধন রাজ্যের দেবীকোট শহরের এক ব্রাহ্মণের সন্তান ছিলেন। বর্তমানে এই দেবীকোট হিসেবে গঙ্গারামপুরকে চিহ্নিত করা হয়। এই সময় দেবীকোট ছিল ব্রাহ্মণদের আশ্রিত মন্দিরে পরিপূর্ণ শহর। আবার আরেক তথ্য অনুযায়ী চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের জৈন গুরু ভদ্রবাহু দেবীকোটে জন্মগ্রহণ করেছিল।

গুপ্ত যুগে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাষন কাল থেকেই বালুরঘাট তথা তার পার্শ্ববর্তী এলাকা উন্নতি লাভ করতে থাকে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের উত্তর পুরুষ হিসেবে দ্বিতীয় কুমার গুপ্ত তার এই কার্যকলাপকে অনবরত রাখেন , এবং কয়েকটি বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ করেন। দ্বিতীয় কুমার গুপ্তের নাম অনুসারে বালুরঘাটের পার্শ্ববর্তী একটি এলাকার নাম হয়েছে কুমারগঞ্জ। হিলির বৈগ্রাম নামের একটি গ্রামে একটি তাম্রপট্ট ( তামার পাতলা পাতের উপর লিখিত আকারে দস্তাবেজ) পাওয়া গেছিল, যেটি থেকে প্রথম কুমার গুপ্ত এর জমি ব্যবস্থা জানা যায়। যেখান থেকে বোঝা যায় যে এই এলাকায় গুপ্ত শাষকের রাজ ছিল। এখনো দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে উঠে আসা প্রাচীন কালের মূর্তিগুলো সেই সময়ের শিল্পকলার উৎকর্ষতা প্রমাণ করে আসছে প্রতিনিয়ত।

মধ্যযুগ

প্রাচীন যুগের বিষয়ে তেমন কিছু তথ্য না পাওয়া গেলেও মধ্য যুগে বালুরঘাট এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা সমূহের উন্নতি সাধন হয়েছিল তা নিঃ সন্দেহে বলা যায়। বিশেষ করে পাল সাম্রাজ্যের সময়ে, পাল যুগের কয়েকটি রাজার নাম অনুসারে বালুরঘাটের পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকার নাম রয়েছে, যেমন - মহিপাল, রামপুর, গোপালপুর, এছাড়াও আরো কয়েকটি স্থান রয়েছে।

প্রথম মহিপাল প্রজাহৈতষী রাজা হিসেবে পরিচয় লাভ করেন। তিনি উত্তরবঙ্গ সহ পূর্ব বঙ্গের বেশ কিছু রাজ্যে জয়লাভ করেন, যার ফলে বালুরঘাট তার রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। কৃষক তথা জনগণের জন্য কয়েকটি দিঘী খনন করেন, যার একটি রয়েছে মহিপাল এলাকায়, যেটি বর্তমানেও মহিপাল দিঘী নামেই পরিচিত। 

তবে এখানেই শেষ নয়, পাল সাম্রাজ্যের অন্যতম রাজা ধর্মপাল যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেন, তার একটি বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ দিনাজপুরের কোন এক স্থানে করেছিলেন, অনেক ঐতিহাসিকদের মতে সেটি বর্তমানে হরিরামপুর অথবা বালুরঘাটের কোনো পাশ্ববর্তী এলাকাতে অবস্থিত ছিল।

পাল বংশের অবনতি ঘটতে থাকে দ্বিতীয় মহিপালের‌ সময়ে, তার দ্বারা শাসিত ১০৭০-১০৭৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব কালে তার অপশাসন কৈবর্ত জনগনকে বিদ্রোহ করে তুলেছিল। কৈবর্তরা দিব্যক নামের এক নেতার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। বালুরঘাট থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত মুরারীবাদ নামের স্থানে কৈবর্তরা একত্রিত হয়ে দিব্যক, ভিম নামক নেতাদের নেতৃত্বে যুদ্ধের ঘোষণা করেছিল।


আরো পড়ুন - মালদার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।।


মধ্যযুগের ইতিহাস এখানেই থেমে থেকেছিল এমনটি না। দ্বাদশ শতকে দিকে বালুরঘাটের উপরে হিন্দু সেন বংশের রাজত্ব ছিল। এরপর ১২০৬ সালে বখতিয়ার খিলজীর দ্বারা হঠাৎ আক্রমনের মাধ্যমে লক্ষন সেন পালিয়ে গেলে, বালুরঘাট সহ দক্ষিণ দিনাজপুরে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। হিন্দু ধর্মে পরিচালিত দক্ষিণ দিনাজপুরের মাটিতে মুসলিম শাসন লাভ করলে , হিন্দুদের মাঝে মুসলিম ধর্মের দর্শন তুলে ধরার প্রয়োজন পরে, যেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল মৌলানা আতা উদ্দিন শাহ, যার সমাধি এখনো গঙ্গারামপুরের ধলদিঘীতে রয়েছে। এমনকি বখতিয়ার খিলজীর সমাধি এখনো গঙ্গারামপুরে রয়েছে।

বালুরঘাটের ইতিহাস: প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগের এক শহর।। History of Balurghat: A City from Ancient to Modern Age।।
বালুরঘাট স্বাধীনতা সংগ্রাম

এরপর ১৪৯৯-১৫৩৩ পর্যন্ত যে যে সুলতানরা শাসন করেছিলেন, তারা সকলেই বালুরঘাট এলাকায় বিশেষ নজরদারি রেখেছিলেন, যারা হলেন সামসুদ্দিন মুজাফফর শাহ, আলাউদ্দিন হুসেন শাহ, নাসিরুদ্দিন নাসরত শাহ প্রমূখ। যাদের মধ্যে হুসেন শাহের নাম আজও সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় বালুরঘাট লাগোয়া হোসেনপুর গ্রামে।

মুঘল আমলে বালুরঘাট মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে, কিন্তু এতবড় সাম্রাজ্যে মুঘল শাষকের একার দ্বারা পরিচালনা করা সহজ ছিল না। সুতরাং মুঘল শাষকের সহযোগী হিসেবে হিন্দু রাজা কাশীনাথ রায় বালুরঘাটের কাছেই আত্রেয়ী নদীর তীরে দূর্গ নির্মাণ করেন।

আধুনিক যুগ

সময়ের ব্যবধানে বালুরঘাট সহ সমগ্র বাংলাই ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চলে আসে , সেই সময় বাংলার এই অংশ শাসন করতেন রাজা রাধানাথ রাই। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বাংলার ফকির আর সন্ন্যাসীরা গেরিলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, যেখানে ফকিরদের নেতৃত্ব দিয়েছেন মজনু শাহ এবং সন্ন্যাসীদের নেতৃত্ব দেন ভবানী পাঠক। মূলতঃ এরা রংপুর, কুড়িগ্রাম থেকে গেরিলা যুদ্ধের পরিচালনা হলেও, প্রয়োজনে বালুরঘাট কেও তারা গেরিলা যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করতেন। 

স্বাধীনতা প্রেমী বালুরঘাট বাসিন্দাদের মধ্যে দেশভক্তি তুলে ধরতে একে একে কাজী নজরুল ইসলাম, মুকুন্দ দাস, এমনকি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বালুরঘাট পরিদর্শনে আসেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বালুরঘাটের আত্রেয়ী নদীর তীরে কংগ্রেসের কার্যালয় স্থাপন করেন।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বালুরঘাটের বাসিন্দারা একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৪২ সালের ভারতছাড়ো আন্দোলনে বালুরঘাটে নেতৃত্ব দেন সরোজরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, কানু সেন, শুটকা বাগচী প্রমূখ। আত্রেয়ী নদীর পূর্বতীরে সমবেত হন প্রায় ১০ হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা, যারা ১৪ ই সেপ্টেম্বর বালুরঘাটের ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত থানা এবং অনেক কয়েকটি প্রশাসনিক ভবনের দখল নিয়ে উত্তোলিত ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক সরিয়ে ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়। বালুরঘাট থানার দারোগা সহ সকলে পালিয়ে প্রান বাঁচায়। আন্দোলন কারীদের রোষানলে সেদিন বালুরঘাটে প্রায় ১৬টি অফিস ভস্মীভূত হয়েছিল। টেলিফোনের তার কেটে যানবাহন থেকে সড়ক সংযোগ, সবই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বালুরঘাট প্রথমবারের মত স্বাধীন হয় কিন্তু বালুরঘাট তিনদিন স্বাধীন থাকার পর বৃটিশ সরকার পুনরায় দখল নেয়। বালুরঘাটের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তাৎক্ষণিক সাফল্যের আগুন বালুরঘাটের আশেপাশের এলাকায় ছড়াতে দেরি হয়নি। দেখতে দেখতে ডাঙি, মদনাহার, তপন, লস্করহাট, পারিলাহাটে এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি পারিলাহাটে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে আন্দোলন কারীদের খন্ডযুদ্ধ হয়, যেখানে মোট চার জন ভারতীয় শহীদ হন। অবশেষে পুলিশের অত্যাচারের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বালুরঘাট অভিযানের ১০ দিনের অধ্যায় সমাপ্ত হয়।

ব্রিটিশ সরকারের জোর পূর্বক খাজনা আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে বালুরঘাটের খাঁপুরে কৃষকরা এই অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। অর্ধেক নই, তিনভাগের একভাগ খাজনা হিসেবে গ্রহন করতে হবে সরকারকে। এই দাবিকে অস্ত্র করে ১৯৪৭- সালে ২০ ফেব্রুয়ারী প্রায় শতাধিক কৃষক মিছিলে বের হয়, মিছিলের দলটি এগিয়ে যেতেই ব্রিটিশদের পুলিশ বাহিনী মিছিলের উপর গুলি চালাতে থাকে। মোট ২২ জন কৃষক শহীদ এবং প্রায় ৫০ জন কৃষক পুলিশের গুলিতে জখম হন।

কিন্তু এত রক্তক্ষয় সংগ্রামের পরেও বালুরঘাট ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা লাভ করেনি। ১৫ আগষ্ট ভারতের স্বাধীনতা লাভের কালপঞ্জী ঘোষণা করা হলেও, বালুরঘাটের অস্তিত্ব পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবে নাকি ভারতের সাথে যুক্ত হবে, তা নিয়ে বিড়াম্বনা দেখা দেয়। কেননা বালুরঘাট বাসিদের অন্তরে ভারতের সাথে যুক্ত হবার ইচ্ছা প্রবল ছিল, এবং সেই হিসেবে পাকিস্তানের সৈনিকদের বালুরঘাট ছেড়ে চলে যেতে হত ১৪ আগষ্টের মধ্যে। কিন্তু ১৪ অগাস্ট রাতে পাকিস্থানি সৈন্য বাহিনী ও পাকিস্তানি নেতারা বালুরঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ে হাজির হয় এবং সমস্ত কিছুর দখল নিতে থাকে। প্রায় গোটা বালুরঘাট ছেয়ে ফেলা হয় পাকিস্তানের পতাকায়। পরের দিন ১৫ অগাস্ট স্বাধীন পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বালুরঘাটে মহকুমা শাসক পানাউল্লা সাহেব পাকিস্তানের পতাকা তোলেন।

এই সময় ভারতের প্রতি ভালোবাসা সম্পন্ন বালুরঘাটের বেশ কিছু জায়গায় সাধারণ যুবক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা সশস্ত্র ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, এবং বালুরঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কুমুদরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় পাকিস্তানি পতাকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তুলতে বাধা দেন।

পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু স্থানে জনগনের এহেন প্রতিরোধে স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ বালুরঘাট সহ বেশ কিছু এলাকাকে "নোশনাল এরিয়া" বলে ঘোষণা করতে বাধ্য হন। অবশেষে "নোশনাল এরিয়া" এর তকমা সরিয়ে দিয়ে ১৭ অগাস্ট বালুরঘাট সহ মোট পাঁচটি থানা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তার ফলে পাকিস্তানি সেনাদের বালুরঘাট ছাড়তে হয় এবং ১৮ অগাস্ট সকালে বালুরঘাটে ভারতের সেনাবাহিনী প্রবেশ করে, এবং পাকাপাকি ভাবে ১৮ অগাস্ট বালুরঘাট ভারতের অংশ হিসেবে ভাবে স্বাধীনতা লাভ করে ও স্বাধীন বালুরঘাটে প্রথম সরোজরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় দ্বারা ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

রবিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

ফুলন দেবীর ডাকাত দলের সর্দার বেনডিট কুইন থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে উঠার কাহিনী।। Phoolan Devi is the story of Bandit Queen becoming a politician ।।

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৩

 কথায় বলে - নির্যাতন যখন সীমা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে থাকে তখন নির্যাতিতা নারীরাও পুরুষের মত আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠে। এমনি কয়েকটি বাস্তব চরিত্রের কয়েকজন নারী ছিলেন ফুলন দেবী, সীমা পরিহার,পুতলী বাঁই, মুন্নি দেবী প্রমুখ।

ভারতের ইতিহাসে এই নারীরা বিখ্যাত নাকি কুখ্যাত? বলা সম্ভব নয়, তবে তাদের জীবনি নিশ্চিত করে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ভারতের জাতিভেদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নারী নির্যাতনের ধারাবাহিকতা কতটা উলঙ্গপনাই রয়েছে, যার দরুন এই নারীরা বাধ্যতামূলক ভাবে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র এবং নিজেদের রুপান্তরিত করেছিল ডাকাতদের রানি হিসেবে। শুধুমাত্র ফুলন দেবীর উপরেই ছিল আটচল্লিশটি অপরাধের অভিযোগ, যার মধ্যে রয়েছে অপহরণ, লুটপাট এবং বাইশটি খুন, এবং সীমা পরিহারের উপরে ছিল ফুলন দেবীর থেকেও বেশী অপরাধের দায়ভার। তবুও অপরাধ জগতের গন্ডী পেরিয়ে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ তৈরি করে এক লোমহর্ষক কাহিনীর‌‌।

 ফুলন দেবী
 ১০ আগস্ট ১৯৬৩ সালে উত্তরপ্রদেশের একটি গ্রামের দলিত দারিদ্র পরিবারে ছোট্ট মেয়েটি একদিন চম্বল এলাকার ত্রাস হয়ে উঠবে তার ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তার বাবা দেবীদিন। কিন্তু নিয়তির খেলায় সেই ছোট্ট ফুলনী হয়ে ওঠে ডাকাত রানী।
বাবার নিরক্ষরতার সুযোগ নিয়ে ফুলনের মামা তাদের স্থাবর অস্থাবর দখল করে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে। গরিব পিতা দেবীদিন বাধ্যতামূলক মাত্র এগারো বছর বয়সে ফুলনের বিয়ে দিয়ে দেন ৩১ বছর বয়সি পুট্টিলালের সাথে। বাল্যবিবাহের শিকার ছোট্ট ফুলন স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ফিরে আসে বাবার বাড়িতেই।

ফুলন-দেবীর-ডাকাত-দলের-সর্দার-বেনডিট-কুইন-থেকে-রাজনীতিবিদ-হয়ে-উঠার-কাহিনী-Phoolan-Devi-is-the-story-of-Bandit-Queen-becoming-a-politician
ফুলন দেবীর আত্মসমর্পণ 


তবুও ফুলনের জীবনের অভিশাপ পিছু ছাড়েনি, বাবু গুজ্জর নামের এক ডাকাত সর্দারের নেতৃত্বে ডাকাতের দলেরা ফুলন দেবীকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাই, সেই পুরনো জমির অমীমাংসিত কারনের জন্য, এবং এই গুজ্জর ডাকাত এবং তার সঙ্গীদের দ্বারা তাকে বারবার ধর্ষণ করা হয়।
এভাবে চলতে থাকা বিষাক্ত জীবনে কিছুটা আশার আলো দেখা দেয়। বাবু গুজ্জরের ঘনিষ্ঠ সেকেন্ড ইন কমান্ড বিক্রম মাল্লার সাথে ফুলন দেবী প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিক্রম মাল্লা হয়ে উঠে সেই ব্যাক্তি যে ডাকাত সর্দার বাবু গুজ্জরকে মেরে ফেলে ফুলন দেবীকে বিয়ে করেন এবং ডাকাত দলের নতুন সর্দার হয়ে উঠেন। বিক্রম মাল্লাই ফুলন দেবীকে রাইফেল ব্যবহার করার প্রশিক্ষণ দেন এবং বিক্রম মাল্লার হাত ধরেই ফুলন দেবী পুরুষের মতন পোষাক পড়ে বছরের পর বছর ধরে ট্রেন ডাকাতি, বাস ডাকাতি, বিভিন্ন গ্রামে ডাকাতি করতে শুরু করেন। সময়ের ব্যবধানে পরিচয় লাভ করে ডাকাত রাণী হিসেবে।
আরো পড়ুন- পাশমিনা শাল আভিজাত্যের প্রতীক।

ফুলন দেবীর ভাগ্য পুনরায় পাল্টি খেয়ে যাই। তাদের পূর্বতন ডাকাত দলের অন্যতম প্রাক্তন সর্দার রাম শিং তার ভাই লল্লারাম শিং সাথে জেল থেকে মুক্তি পাই। এই দুই ডাকাত ভাইরা ছিল উচ্চ সম্প্রদায় ঠাকুর সম্প্রদায়ের (ঠাকুররা উচ্চ ক্ষত্রিয় বর্ণের উপজাতি ) লোক। তারা পুনরায় ফিরে দলে ফিরে এলে, দলের ক্ষমতা দখলের জন্য এই দুই ভাই এবং বিক্রম মাল্লার সাথে লড়াই শুরু হয়। এই ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটে বিক্রম মাল্লার মৃত্যুর সাথে। ফুলন দেবীর স্বামী বিক্রম মাল্লার মৃত্যু হলে রাম শিং ও তার ভাই লল্লারাম শিং ফুলন দেবীকে তাদের আগের গ্রাম বেইমাতে তুলে নিয়ে আসে। এই গ্রামে ফুলন দেবী একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হন ঠাকুর কুলের দ্বারা।

ফুলন দেবী এই নরকের যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খুঁজতে থাকে। একদিন সুযোগ বুঝে তিনি সেই গ্রাম থেকে পালিয়ে যান, এবং মান শিং নামের আরেক ডাকাতের শরনাপন্ন হন। ডাকাত মান শিং এবং ফুলন দেবী আরেকটি ডাকাত দলের নির্মাণ করেন। ফুলন দেবী রাম শিং তার ভাই লল্লারাম শিং এবং ঠাকুর সম্প্রদায়ের লোকেদের দ্বারা ধর্ষণের প্রতিশোধের জন্য তার দলের সাথে বেইমাতে ফিরে আসে আর শুরু করে লুন্ঠন রাজ। রাম শিং তার ভাই লল্লারাম শিংকে গ্রামে না পেয়ে ফুলন দেবী ঠাকুর কুলের বাইশজন লোককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ইতিহাসের এই হত্যা কান্ডটি বেইমাই গণহত্যা কান্ড নামে পরিচিতি পাই।

বেহমাই হত্যাকাণ্ডের পর ফুলন দেবীর জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি দুটোই বাড়তে থাকে। কেননা দলিত নারী হয়েও তিনি উচ্চ কুল ঠাকুরদের কাছ থেকে তার ধর্ষনের বদলা নিতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে ঠাকুর সম্প্রদায়ের লোকেরা ফুলন দেবীর আকস্মিক উত্থানের ভয়ে ফুলন দেবীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করতে শুরু করে। ফলে ঠাকুর কৃষকদের চাপে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ফুলন দেবীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হয়। যার ফলে ১৯৮৩ সালে ফুলন দেবী কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে তার দলবল সহ গ্রেফতার হন।
সেই শর্তগুলো ছিল-
তার দলের কোনো সদস্যদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া যাবেনা।
আট বছরের বেশি তাদের কারাগারে পাঠানো যাবে না‌।
তার পরিবারের অন্যায় ভাবে দখল করা স্থাবর অস্থাবর ফিরিয়ে দিতে হবে।
তার ভাইকে একটি সরকারি চাকরি প্রদান করতে হবে।
একটি দল হিসেবে তাদের মধ্যপ্রদেশের জেলে রাখতে হবে।

শর্তসাপেক্ষে ফুলন দেবীর আট বছর না হয়ে এগারো বছরের জেল হয়। জেল থেকে মুক্তির পর তিনি সমাজবাদী পার্টির সদস্য হিসেবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করে উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরের সংসদ সদস্য হিসাবে লোকসভায় একটি আসন গ্রহণ করেন। এই জয়ের পিছনে তার জীবনের লড়াই সংগ্রামকে কারন হিসাবে অনেকেই বিবেচনা করেন। যাই হোক ক্ষমতা থাকা কালীন সমাজবাদী পার্টি থেকে মুলায়ম সিং যাদবের চেষ্টায় কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশে ফুলন দেবীর বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু ২০০১ সালের পঁচিশে জুলাই বেইমাই গনহত্যার প্রতিশোধ স্বরুপ শের সিং রানা তাকে তার বাড়ির বাইরে গুলি মেরে হত্যা করে।
ফুলন দেবীর জীবনি এতটাই লোমহর্ষক ছিল মে তার জীবনীর উপর বলিউডে "ব্যান্ডিট কুইন" নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়, যেটি গোটা বিশ্বে সারা ফেলেছিল। তার আত্মজীবনী শিরোনাম ছিল "আমি, ফুলন দেবী"। যে বইটিতে তার জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন।

সোমবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৩

রহস্যময় অন্ধ লোকেদের গ্রাম টিলটাপেক।। TILTEPEC, THE VILLAGE OF THE MYSTERIOUS BLIND PEOPLE ।।

আগস্ট ২৮, ২০২৩

 অদ্ভুত অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। এ যেন ঠাকুরমার ঝুলি থেকে পার্থিব জগতে প্রবেশ করা কোনো এক গ্রাম। যার রহস্য একুশ শতকের বৈজ্ঞানিকদের কাছেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কি সেই রহস্য! যার রহস্য উন্মোচনে সকল তাবোড় তাবোড় বৈজ্ঞানিকরা আজও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে বাস্তব পৃথিবীতে এমন একটি গ্রাম রয়েছে, যেই গ্রামের পশু পাখি থেকে শুরু করে বেশিরভাগ মানুষজন অন্ধ। সেই গ্রামটির নাম টিলটাপেক গ্রাম, অবস্থিত মেক্সিকো প্রদেশের অক্সজাকা এলাকায়।

কিন্তু এমন কেন? তার উত্তর রয়েছে দুটি, এক প্রচলিত স্থানীয় মতবাদ, দ্বিতীয়টি বৈজ্ঞানিক মতবাদ। দুটি মতবাদের মধ্যে কোনটি সঠিক তার কোনো পরীক্ষিত প্রমান নেই। তবে প্রথম মতবাদটি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে বেশি গ্রহনযোগ্য।

 প্রথম মতবাদ

প্রথম মতবাদটি কল্পকাহিনীর মতনই খুবই রোমাঞ্চকর, কোনো এক অভিষিক্ত গাছ। এই অভিষিক্ত গাছ স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে লাভাজুয়েলা গাছ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

রহস্যময় অন্ধ লোকেদের গ্রাম টিলটাপেক।। TILTEPEC, THE VILLAGE OF THE MYSTERIOUS BLIND PEOPLE ।।
টিলটাপেক গ্রামের অন্ধ ব্যাক্তি 

এই গ্রামের অধিবাসীদের মতে এই গাছটির অস্তিত্ব রয়েছে, এবং এই গাছের দর্শন যারা পাই (পশু পাখি যাই হোকনা কেন।) তারা চিরতরে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে বা অন্ধ হয়ে যাই। তাদের মুখে এই অভিষিক্ত গাছের বিষয়ে একটি লোককথা শোনা যায়। সেই গল্পটি হল নিম্নরূপ-

এক সময় এই টিলটাপেক গ্রামে লাভাজুয়েলা নামে এক দর্শনীয়, অহংকারী, দয়ামায়া হীন এক যুবক বাস করতো। সে একদিন জঙ্গলে শিকার করতে বেরিয়ে পরে। শিকার করার সময় সে খুবই সুন্দর হরিণ দেখতে পাই। লাভাজুয়েলা সেই হরিণটিকে তির দিয়ে মারতে গেলে হরিণটি মানুষের সুরে বলে উঠে - আমাকে মেরো না আমি ভগবানের দ্বারা পাঠানো এক দূত, আমাকে মারলে তোমাদেরই ক্ষতি হবে। কিন্তু লাভাজুয়েলা তার কোনো কথা না শুনে অহংকারের সাথে ভগবানের তাচ্ছিল্য করে এবং তির দিয়ে হরিণটিকে বিদ্ধ করে। বিদ্ধ হবার সাথে সাথেই সাদা উজ্জ্বল আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার সাথেই লাভাজুয়েলা তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। লাভাজুয়েলা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার পরেই তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। এই অন্ধ অবস্থায় সে টিলটাপেক গ্রামে পৌঁছলে গ্রামের সকলকে তার দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে ব্যাক্ষা দেয়। এতে গ্রামের মানুষজন লাভাজুয়েলার উপর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, কেননা গ্রামবাসীদের মতে লাভাজুয়েলা গ্রামে প্রবেশ করাই সেই অভিশাপ গ্রামেও প্রবেশ করবে। তাই গ্রামের সকলে লাভাজুয়েলাকে তাড়িয়ে দেই। লাভাজুয়েলা অনুতপ্ত হয়ে শিকার করার স্থানে গিয়ে বুঝতে পারে যে, ঠিক যেই স্থানে সে হরিণটিকে বিদ্ধ করেছিল ঠিক সেই স্থানেই লতাপাতাহীন, কাঁটাযুক্ত একটি গাছের উদয় হয়েছে। লাভাজুয়েলা সেই গাছের সামনে তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা যাচনা করে। কিন্তু গাছটি সেই স্থানেই বিদ্যমান ছিল, এবং সেই গাছের নিচেই লাভাজুয়েলা মারা যাই। লাভাজুয়েলা মারা যাবার পর তার এই কৃতকর্মের ফল টিলটাপেক গ্রামকে বহন করতে হয় এখনো। সেই থেকেই এই গাছের নাম রাখা হয়েছে লাভাজুয়েলা।

রহস্যময় অন্ধ লোকেদের গ্রাম টিলটাপেক।। TILTEPEC, THE VILLAGE OF THE MYSTERIOUS BLIND PEOPLE ।।
শিল্পীর চোখে টিলটাপেক অন্ধদের গ্রাম

লোককথা অনুযায়ী এই গাছ যারা দেখে তারা তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধ হয়ে পরে।

দ্বিতীয় মতবাদ

এই মতবাদ বৈজ্ঞানিক মতবাদ তবে এর সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়। বৈজ্ঞানিকদের মতে টিলটাপেক গ্রামের এই পরিস্থিতির পিছনে দায়ি এক বিশেষ ধরনের বিষাক্ত মাছি। এই মাছি যাদের কামড়ায় তারা এক বিশেষ ধরনের পরজিবীর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিজেদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে, তা সে পশুপাখি বা মানুষই হোক না কেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এটি বৈজ্ঞানিক মতবাদ হলেও, এর কোনো প্রমাণ নেই। কেনোনা এযাবৎ যতজন বৈজ্ঞানিকরা টিলটাপেক গ্রামে গেছেন তারা শুধুমাত্র স্বল্প দিনের পরিদর্শনের জন্যে গেছেন। কেনোনা তাদের মধ্যেও সেই একই, অন্ধ হবার ভয়টাই কাজ করে।

তাছাড়াও শহর থেকে গভীর জঙ্গলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সরঞ্জামসহ এমন একটি গ্রামে যেখানে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ভয় রয়েছে, সেই গ্রামে বৈজ্ঞানিকদের দল যেতে খুব একটা সাহস পায় না। যার দরুন এই অন্ধদের গ্রামের এই রহস্য এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে। 

রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৩

মালদা জেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।। SHORT HISTORY OF MALDA DISTRICT ।।

আগস্ট ২৭, ২০২৩


মালদা জেলার মালদা শহর পশ্চিমবঙ্গের বুকে এক অনবদ্য জায়গা করে নিয়েছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ফজলি আম, গম্ভীরা গান, হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের বড় ধরনের আবেগ, প্রাচীন থেকে বর্তমান পর্যন্ত সুবিস্তৃত ইতিহাস এবং তার ধ্বংসাবশেষ সব কিছু মিলিয়ে মালদা যেন আজ বাংলার সম্মান স্বরুপ। প্রাচীন থেকে বর্তমান পর্যন্ত সুবিস্তৃত ইতিহাসের আঁতুড়ঘর মালদা। তাই বর্তমানে ইতিহাস প্রেমি দর্শনার্থীদের জন্য মালদা এক অনন্য গন্তব্য। চলুন হালকা করে জেনে নিই সেই ইতিহাস।

প্রাচীন কাল:
মালদা ছিল ইতিহাস প্রসিদ্ধ প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন নামের রাজ্যের অংশ, যেখানে মৌর্য সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্য এবং পাল সাম্রাজ্য দ্বারা শাসিত ছিল। চন্দ্রগুপ্ত নন্দ বংশকে পরাজিত করলে মগধ তার দখলে চলে আসে, আর মালদা সে সময় তার অংশ ছিল। এরপর বিন্দুসার রাজত্ব করে। বিন্দুসারের পর সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে অনুতপ্ত হলে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন ও প্রচারে ব্রতি হন এবং তার সাক্ষ্য হিসেবে অনেকগুলো শিলালিপি তিনি খদিত করান। যার কয়েকটি মালদাতে রয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ ঘোষরায়ন পিলার এবং মাহাশথাঙ্গার শিলালেখ।

আদিনা মসজিদের ইতিহাস জানতে ক্লিক করুন -> আদিনা মসজিদের ইতিহাস 
এরপর গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ে সমুদ্রগুপ্ত থেকে স্কন্দগুপ্ত সকলের সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে মালদা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইতিহাসের প্রবাদ প্রতিম ব্যাক্তি পাণিনি তার গ্রন্থ "অষ্টাধ্যায়ী" তে গৌরপুরা নামের একটি শহরের উল্লেখ করেছেন, সম্ভবত সেটি মালদাতে অবস্থিত ছিল। এমনকি চীনা পরিব্রাজক জুয়ানজাং পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুন্ড্রনগর পরিদর্শন করেন যেটি ছিল গৌরপুরার পাশ্ববর্তী এবং তিনি এখানে অনেক স্তূপ ও মঠ দেখেছিলেন।
পরবর্তীতে পাল সাম্রাজ্যের সময়ে গোপাল পাল থেকে শুরু করে একে একে ধর্মপাল,দেবপাল, মহিপাল, রামপাল, সকলেই রাজত্ব করেছেন। পাল রাজত্বের আমলে মালদার গৌড় হয়ে উঠেছিল প্রাণকেন্দ্র। মালদার পাশ্ববর্তী বর্তমানে যেটি পাহাড়পুর সেটি পালযুগে সোমাপুর নামে পরিচিত ছিল, যা ধর্মপালের আরেক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে মহিপাল মালদার পাশ্ববর্তী অনেক এলাকায় কৃষকদের জন্য জলাধার তৈরি করেন। এছাড়াও দেবপাল তৎকালীন মালদার জগদ্দলে বৌদ্ধ মঠ তৈরি করেছিলেন। প্রথম মহিপাল আদিনায় একটি হিন্দু মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়াও পালযুগের রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে, যেমন সন্ধ্যাকর নন্দির রামচরিতমানস, খালিমপুর তাম্রলিপি , তারানাথের লেখা থেকেও মালদার তৎকালীন অবস্থার কথা জানতে পারা যাই।
 মধ্যযুগে মালদা:
মধ্যযুগে পাল রাজাদের পরাজিত করে মালদাতে সেন রাজবংশের উত্থান হয়েছিল, এবং এই সেন বংশের রাজারা ধর্মীয় দিক দিয়ে হিন্দু ছিল। লক্ষন সেন রাজা হয়ে তাদের রাজধানী মালদার গৌড়ে স্থানান্তর করেন এবং তার নাম অনুসারেই তিনি তার রাজধানীর নাম রাখেন লক্ষ্মণাবতী, সুতরাং আমরা বলতে পারি মালদার পূর্বের নাম ছিল লক্ষ্মণাবতী। লক্ষন সেন একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন যা বর্তমানে মালদার রামকেলিতে অবস্থিত।

মালদা জেলার কিছু ঐতিহাসিক স্থান 


কিন্তু ১২০৬ খ্রীঃ বখতিয়ার খিলজী বর্তমানের মালদা তৎকালীন লক্ষ্মণাবতীতে আক্রমন করলে লক্ষন সেন পালিয়ে গেলে সেন রাজত্ব শেষ হয় এবং মালদাতে মুসলিম শাসন শুরু হয়। বর্তমানে মালদাতে ছরিয়ে ছিটিয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলো মুসলিম আমলেই তৈরি যেমন- আদিনা মসজিদ, ছোটসোনা মসজিদ,বড়সোনা মসজিদ,ফিরোজ মিনার, লোটন মসজিদ, চিকা মসজিদ এবং দাখিল দরওয়াজা ইত্যাদি। এছাড়াও বখতিয়ারের আক্রমনে দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর রাজত্বের অংশ হিসেবে মালদা সংযুক্ত হয়, তার প্রমাণ স্বরুপ রয়েছে মালদার ফিরোজ মিনার যেটি তৈরি করেন সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ।
পরবর্তীতে মুঘল রাজারা প্রায় গোটা ভারতব্যাপী রাজত্ব কায়েম করলে মালদা তার অংশ হয় এবং মালদাতে শাহ সুজা দাখিল দারয়াজা তৈরি করেন।
প্রারম্ভিক আধুনিক সময়ের মালদা:
ষোড়শ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের দূর্বলতার সুযোগে বাংলার নবাব শক্তিশালী হয়ে উঠে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন মুর্শিদকুলি খান, যিনি মুর্শিদাবাদ শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এটিকে তার রাজধানী করেছিলেন। কিন্তু মালদার প্রতি তার আনুগত্য ধরে রেখেছিলেন।
ঔপনিবেশিক সময়কাল‌ থেকে স্বাধীনতা
১৮৫৭ সালে ইংরেজদের সাথে সিরাজদ্দৌলার পলাশীর যুদ্ধের পর  মালদা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। মালদা ছিল ইংরেজদের প্রথম পছন্দ তাই ইংরেজরা তাদের প্রশাসনিক সদর দফতর সেই সময় মালদাতে নির্মাণ করেন, সেই স্থান বর্তমানে ইংরেজবাজার নামে পরিচিত, এমনকি তারা মালদায় একটি কোষাগার ও আদালতও খোলেন। কিন্তু বাংলার বিপ্লব থেকে কিছুটা রেহাই পেতে এবং প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে বাংলাকে কয়েকটি জেলা ও মহকুমায় বিভক্ত করে। যার ফলে মালদা প্রথমে দিনাজপুর জেলার অংশ তারপর পূর্ণিয়া জেলা, তারপর রাজশাহী বিভাগের সাথে যুক্ত হয়, কিন্তু ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর, মালদা ভারতের সংযুক্ত হয়, এবং স্বাধীনতার পর মালদা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮১ সালে একটি পৃথক জেলা হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৩

বিটকয়েন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি কি? বিটকয়েন দিয়ে লেনদেন কিভাবে হয়? WHAT IS BITCOIN AND CRYPTOCURRENCY? HOW DOES BITCOIN TRANSACTIONS WORK?

আগস্ট ২৩, ২০২৩

 "বিটকয়েন" শব্দটি শুনলেই মনে হয় যেন এটি ধনকুবের তার হিসাব খাতা নিয়ে হিসেব নিকেষ করছে। অনেকের মনেই বিভিন্ন প্রশ্ন উঁকি মারে যখন তারা বিটকয়েন শব্দটি শুনে। বর্তমানে বিটকয়েন দ্বারা অনলাইনে কেনাকাটার বিপুল পরিমাণ ব্যবহার মানুষ করে থাকেন, এবং বিটকয়েনের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বিশ্বের জনমানুষের কাছে গ্রহনযোগ্যতা বাড়ছে। কিন্তু কি এই বিটকয়েন? কোন সরকার একে নিয়ন্ত্রণ করে? ভারতীয় বাজারে এর বাট্টাই (এক বিটকয়েন সমান ভারতীয় কত টাকা) বা কত? আরো বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে যেগুলো বিষয়ে অনেক মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ভুল ধারণা রয়েছে।

 বিটকয়েন 

"বিটকয়েন" আসলে এক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। ক্রিপ্টোকারেন্সি হল সেই কারেন্সি যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই, অন্য দেশের মুদ্রা যেমন ভারতীয় রুপি, বাংলাদেশী টাকা, আমেরিকার ডলার যাদের ভৌত অস্তিত্ব আছে বা আপনি চাইলে কারেন্সিগুলো পকেটে বা মানিব্যাগে রেখে যে কোনো দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করতে পারেন। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি হল সেই কারেন্সি যা আপনি মানিব্যাগে রাখতে পারবেন না, অর্থাৎ যে কারন্সির অস্তিত্ব শুধুমাত্র ইন্টারনেটে ডিজিটাল কারেন্সি হিসাবে।

Bitcoin-minning-cryptocurrency
বিটকয়েন মাইনিং 

বর্তমানে অনেক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে, প্রায় চার হাজারের উপরে যেমন- বিটকয়েন, এথেরিয়াম, লাইটকয়েন, ডোজকয়েন, ফেয়ারকয়েন, মনেরো ইত্যাদি। যাদের মধ্যে ডিজিটাল কারেন্সি হিসাবে বিটকয়েন সবথেকে বেশী পরিচিত। ভারতীয় রুপির যেমন সংকেত ₹, তেমনি বিটকয়েনের সংকেত ₿।

গোটা বিশ্বে যত ধরনের কারেন্সি রয়েছে (তা সে ডিজিটাল হোক বা মুক্ত কারেন্সি) সবথেকে বিটকয়েনের মূল্য বেশি যার বর্তমান বাট্টা রয়েছে এক বিটকয়েন সমান ২১ লক্ষ ৭৩ হাজার ভারতীয় রুপির সমান। অবাক করার বিষয় হল জন্মলগ্ন থেকে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে যার বাট্টা শূন্য রুপি থেকে প্রায় ২২ লক্ষে পৌঁছে গেছে। এবং এটিও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সির জন্মলগ্ন

বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সি দ্বারা লেনদেনের যে প্রক্রিয়া চলছে তা একটি ধারনার ফসল। ভাবতেও অবাক লাগে কোনো এক ব্যক্তির বিশেষ কল্পনা বাস্তবে রূপ নেবে।

সেই ধারনাটা কি ছিল? এমন একটি কারেন্সি ব্যবস্থা চালু করা যা কোনো সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না, তবুও তার গ্রহনযোগ্যতা সব দেশেই থাকবে। মূলতঃ ভারতের কারেন্সি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, বাংলাদেশের কারেন্সি বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আমেরিকার ফেডারাল রিজার্ভ সেই দেশের কারেন্সিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনা। এক্ষেত্রে লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা নিকাশ ঘরের প্রয়োজন হয় না এবং এটি কোন দেশের সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত মুদ্রা নয়। তবুও এর প্রচলন প্রায় সব দেশেই রয়েছে।

আরো পড়ুন - কিছু মরন ফাঁদ পাতা ভিডিও গেম।

২০০৮ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনাম (প্রকৃত পরিচয় এখনো জানা যায়নি) নিয়ে কোনো এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্রিপ্টোকারেন্সির ধারনা নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। যেখানে ডিজিটাল কারেন্সি বিটকয়েনের ব্যবহার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি তার শ্বেতপত্রে বলেছেন- “ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল সমস্যা হলো এর চালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব বিশ্বাস।”

এবং শ্বেতপত্র প্রকাশের পরের বছরেই কম্পিউটারের অপেন সোর্স কোড গুলো ব্যবহার করে অনলাইন ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের পরিষেবা শুরু করেন যা পিয়ার-টু-পিয়ার মুদ্রা বলে অভিহিত হয়।

ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনে লেনদেন

বিটকয়েন যেহেতু এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা বা কারেন্সি, আবার পাশাপাশি যার নিয়ন্ত্রণ কোনো প্রতিষ্ঠান দ্বারা হয় না তাই এর লেনদেনের প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো ব্যাঙ্কের মধ্যস্থতা থাকে না। উদাহরণ হিসেবে আপনি কোনো বৈদেশিক বন্ধুকে টাকা পাঠাতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই কোনো ব্যাঙ্কের দারস্থ হতে হবে, কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে আপনি আপনার বন্ধুকে বিটকয়েন পাঠাতে চাইলে সেক্ষেত্রে আপনাকে ওয়ালেট টু ওয়ালেট পাঠাতে হবে, এবং এদের মাঝে মধ্যস্থতা করে কম্পিউটারের বিশেষ মাইনর প্রক্রিয়া যেটি ব্লকচেইন হিসাবে পরিচিত। যার ফলে দাতা ও গ্রহীতার দুজনের পরিচয় গোপন থাকে। এবং আদান প্রদানের মধ্য যে কম্পিউটারের জটিল গানিতিক সমস্যা সমাধান করে তাকে মাইনর বলা হয়, আর এই মাইনর তার কাজের জন্য বিটকয়েন অর্জন করে। মাইনররা তাদের এই কাজটিকে BITCOIN MINNING বলে থাকেন।

বিটকয়েন লেনদেনের সমস্যা

বিটকয়েনের বিপুল চাহিদা ও জনপ্রিয়তা এবং ক্রেতা বিক্রেতার গোপনীয়তা রক্ষা এছাড়াও বহু কারন রয়েছে যার জন্যে বিটকয়েনকে অনেকে ফিউচার মানি হিসেবে মনে করছে। যার দরুন সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। তবুও এমন অনেক দেশ রয়েছে যেখানে বিটকয়েনে লেনদেন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এই বিধিনিষেধ আরোপ করার কারণ কি?

বিটকয়েন-ক্রিপ্টোকারেন্সি-ডিজিটাল
ভবিষ্যতের মুদ্রা 

প্রথমতঃ- দেশীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিটকয়েনের ব্যবহার, দেশীয় অর্থনীতি বিভাগের কার্যক্ষমতা দুর্বল করে দেবে, এবং ছোট ব্যবসায়িদের ক্ষতি করবে।

দ্বিতীয়তঃ- বিটকয়েনের লেনদেনে সব কিছু গোপন থাকায় কালোধনের পরিমাণ হাজার গুণ বেড়ে যাবে।

তৃতীয়তঃ- বিটকয়েনে মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি লেনদেনে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে।

চতুর্থত-হ্যাকার এবং স্ক্র্যামাররা হামেশাই বিটকয়েন হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। যার শিকার জনগন সহজেই হতে পারে।

পঞ্চম- বিটকয়েনে বিনিয়োগে কোনো প্রকার ব্যাঙ্কিং গ্যারিন্টি না থাকায় তা যে ফেরত আসবেই তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

এছাড়া আরো এমন অনেক বিষয় রয়েছে যার জন্যে বিটকয়েনে লেনদেন অনেক দেশেই অবৈধ। এই বিষয়ে বিটকয়েনের জনক সাতোশি নাকামোতো লিখেছেন -“ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল সমস্যা হলো এর চালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব বিশ্বাস।”

বুধবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৩

পাশমিনা শাল আভিজাত্যের প্রতীক ও ভারতের গর্ব ।। PASHMINA SHAWL THE PRIDE OF INDIA ।।

আগস্ট ১৬, ২০২৩

 পাশমিনা শাল, ভারতের তৈরি এবং গোটা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় তাঁত নির্মিত খুবই উচ্চমানের শাল। পাশমিনা মূলতঃ কাশ্মিরে তৈরি করা হয়, এবং যার সুনাম রয়েছে সমগ্র ভারতে। পাশমিনা শাল অন্যান্য শালের তুলনায় আরামদায়ক এবং উষ্ম। ভারত সরকারের দ্বারা ২০০৮ সালে কাশ্মিরের উৎপাদিত এই শালটিকে G.I ট্যাগ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।

পাশমিনা শালের ব্যবহারের ইতিহাস বহু পুরাতন, ভারতীয় রাজা, মহারাজারা পাশমিনা শাল ব্যবহার করতেন। পঞ্চদশ শতকের দিকে এই পাশমিনা শালের ব্যবহার আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো, এবং এখনো কোনো বিশিষ্ট অনুষ্ঠানে সম্মান প্রদর্শনের জন্য পাশমিনা শালের ব্যবহার করা হয়।

কিভাবে তৈরী করে

পাশমিনা শাল তৈরী হয় বিশেষ প্রজাতির পাহাড়ী ছাগলের পশম দিয়ে। ছানথাঙ্গি নামক এই পাহাড়ী ছাগলের প্রজাতি মূলতঃ ভারতের কাশ্মিরের লাদাখের, হিমাচল প্রদেশের এবং নেপালের উচ্চ পাহাড়ী এলাকায় পাওয়া যায়। মাংস এবং পশম উভয়ের জন্যই ছানথাঙ্গি ছাগলের চাষ করা হয় বহুল পরিমানে। প্রথমে সুন্দর পশমযুক্ত ছানথাঙ্গি ছাগল বেছে আলাদা করে রাখা হয়, অতঃপর সেই ছাগলগুলো থেকে কাঁটাই যন্ত্র দ্বারা লোমগুলো আলাদা করা হয়ে থাকে। 

ছানথাঙ্গি ছাগল 

জমাকৃত পশম উনগুলো তাদের গুনগত মান অনুযায়ী আলাদা করা হয়, মূলতঃ ছাগলের লোমের দৈর্ঘ্য যত লম্বা ও যত পাতলা হবে সেই লোমের গুনগতমান ততবেশী মনে করা হয়। এবং, তারপর খুবই যত্ন সহকারে বাছায় করা পশমগুলো জল দিয়ে ধুয়ে সূর্যের আলোয় শুকতে দেওয়া হয়। শুকোনোর পর সেই পশমগুলো প্রচলিত স্থানীয় সুতো কাটার যন্ত্র ইয়েন্দার নামক চড়কা দ্বারা সুতোকাটা হয়, যদিও বর্তমানে বিদ্যুৎ চালিত সুতোকাটা যন্ত্র বহুল প্রচলিত হয়েছে। সুতো তৈরি হয়ে গেলে, সেই সুতো নক্সা অনুযায়ী শাল তৈরীর বুনোন যন্ত্রে সাজানো হয়, যেমনটা শাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এরপর শালগুলোকে রং করে, শেষবারের মতো ধুয়ে বাজারজাত করা হয়।

 নকল ও আসল

বাজারজাত পাশমিনা শাল হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকায় বিক্রি করা হয়, তবে তা অবশ্যই তার গুনগত মান এবং তার নক্সার উপর নির্ভর করেই। কিন্তু বর্তমানে বাজারে এমন কৃত্রিম ফাইবারের তৈরি এমন অনেক শাল রয়েছে যা দেখে চেনা প্রায় অসম্ভব যে এটি প্রকৃত পাশমিনা শাল, নাকি অন্য কিছু। সুতরাং পাশমিনা শাল ক্ষরিদের সময় অত্যন্ত সজাগ চোখেই পাশমিনা শাল কেনা উচিত। আর এই সজাগ চোখে যে যে বিষয়গুলো নজর রাখা উচিত সেগুলো হলো - প্রথমেই বলে রাখি কৃত্রিম ফাইবারের তৈরি হলেও, তা মানুষের চুলের তুলনায় পাতলা হবেনা। সুতরাং প্রথমেই আপনাকে শাল তৈরীর সুতোর উপরেই নজর দিতে হবে। দ্বিতীয়তঃ অতিরিক্ত পাতলা পশম দিয়ে তৈরী হবার ফলে পাশমিনা শাল অত্যন্ত মুলায়ম। এছাড়াও লেবেল থেকে তার মান ও পরিমাণ দেখে নিতে পারেন, তবে মনে রাখবেন পাশমিনা শালে আঠা দিয়ে লেবেল লাগানো সম্ভব নয়, যদিও বর্তমানে নকল পাশমিনা শালে লেবেল সেলাই করে লাগানো হচ্ছে।

যদি এতকিছু করেও সন্তুষ্টি না আসে তবে এই দুটি বিষয় মেনে চলবেন, এক- পাশমিনা শালে বেশ পারদর্শী এমন ব্যাক্তির সাহায্য নিন। দুই- ছোট বেলার সেই মাথার চুলে কলম ঘষে স্থীর তড়িৎ দ্বারা কাগজের টুকরো হাওয়াতে উড়ানোর পরীক্ষা করতে পারেন।

সোমবার, ৭ আগস্ট, ২০২৩

কোলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল ঘুরে আসুন।। Visiting Kolkata Victoria Memorial hall।।

আগস্ট ০৭, ২০২৩

 ছোটোবেলা থেকেই জন্মেছিল সেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখার প্রত্যাশা। কোলকাতা গিয়েছি অনেকবার কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠেনি একবারও। এবার যেহেতু সুযোগ পেয়েছি তাই ছাড়ার কোনো ইচ্ছে নেই। হেঁটে হেঁটেই স্মৃতি বিজড়িত স্থানের দিকে রওনা দিলাম।

পরপর দুই বছরের দুটি যুদ্ধ ১৮৫৭ সালে পলাশীর, এবং ১৮৫৮ সালে সিপাহী বিদ্রোহ হলে ব্রিটিশ সরকারের মনে হয় ভারতের মত এত বড় দেশকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাষনের মধ্যে না রাখাই উচিত, বরং ব্রিটিশ সরকার নিজেই সেই শাষনভার গ্রহন করুক। এই সুবাদেই রানি ভিক্টোরিয়া ১৮৭৬ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত ভারত শাসন করেছিলেন। এখানে একটি বিষয় জানা উচিত- অনেকেরই মনে হয় রানি ভিক্টোরিয়া, কোলকাতার এই মেমোরিয়াল থাকতেন এবং এখানে থেকেই তিনি তার শাসন চালাতেন। কিন্তু বাস্তবে রানি ভিক্টোরিয়া একবারও ভারতে আসেন নি।

Kolkata-Victoria-memorial-hall
কোলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে আমি

ভারত শাসনকালেই ইংল্যান্ডেই রানীর মৃত্যু হলে, তার পরবর্তী সময়ে  রানি ভিক্টোরিয়ার স্মরণে একটি স্মারক নির্মাণের ধারণা প্রকাশ করেন তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন। এই কাজে তিনি সেই সময়ের বিখ্যাত আর্কিটেক্ট উইলিয়াম এমারসন কে দায়িত্ব দেন এবং তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন ভিনসেট এস। তাদের একান্ত তত্ত্বাবধানে শ্বেত মার্বেল দিয়ে ১৯০৬ সালে এই মেমোরিয়ালের নির্মাণ শুরু হয় এবং সমস্ত কাজ শেষ হয় ১৯২১ সালে। আবার এই বছরেই এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
 কি কি রয়েছে এখানে
দেখার জন্য এখানে অনেক কিছু রয়েছে, বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্পর্কিত বস্তু।
বর্তমানে মেমোরিয়ালটি একটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যাতে ৫০,০০০ টিরও বেশি আইটেমের সংগ্রহ রয়েছে, যেমন চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ছবি, হাতে লেখা গ্রহণপত্র, টাকা, টেকসটাইল এবং ভারতের ইতিহাস এবং শিল্পের সম্পর্কিত আরও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। ভারতের কয়েকজন শাষনকর্তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বিখ্যাত লোকেদের চিত্রকলা এছাড়াও আরো বহু কিছু (সব বলছিনা, আমি চাই আপনারা এগুলো নিজে স্বচক্ষে দেখুন।)। এছাড়াও মেমোরিয়ালটিতে মন ভালো করার মত  ৬৪ একরের একটি বাগান রয়েছে।
যেতে চাইলে যেতে পারেন কোলকাতার খুব একটা দূরে না। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সকাল দশটায় খোলে এবং সারাদিন সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকার পর সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করে দেয়া হয়। ভারতীয়দের প্রবেশমূল্য জনপ্রতি তিরিশ টাকা।

কিভাবে যাবেন 

আপনি উত্তরবঙ্গ থেকে কোলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখার জন্য বিভিন্ন উপায়ে যেতে পারেন। আমি আপনাকে কিছু সুবিধাজনক ও সস্তা উপায় বলে দিচ্ছি

রেল: আপনি উত্তরবঙ্গের যে কোনো রেলওয়ে স্টেশন থেকে কোলকাতা (শিয়ালদা, হাওড়া, কোলকাতা) এর দিকে রেলের টিকিট কাটিয়ে নিতে পারেন। এবং সেখান থেকে বাসে চেপে যেতে পারেন।

রোড: আপনি উত্তরবঙ্গের যে কোনো বাস-স্ট্যান্ড (শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, মালদা) থেকে কোলকাতা ধর্মতলা গিয়ে সেখান থেকে খুব কাছে আপনারা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পেয়ে যাবেন , ধর্মতলা থেকে চাইলে আপনি বাসে করেও মেতে পারেন।

আকাশপথে: শিলিগুড়ি বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে কোলকাতা দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছে আপনি বাসে ধর্মতলা গিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেতে পারেন। অথবা দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি অথবা ক্যাব ভাড়া করে সরাসরি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঘুরে আসতে পারেন।

মনে রাখবেন, ধর্মতলা থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল যেতে গেলে আপনাকে ৭ নম্বর বাসে চেপে বসতে হবে।

শুক্রবার, ৪ আগস্ট, ২০২৩

হিন্দুদের ভবিষ্য পুরাণে যীশুর বিষয়ে যা বলা হয়েছে।। JESUS IN HINDU MANUSCRIPT BHAVISHYA PURANA ।।

আগস্ট ০৪, ২০২৩

 প্রভু যীশু খ্রীষ্টের জীবনী ও তার মতাদর্শ আজও গোটা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষের আস্থা স্বরুপ, তথাপি তার বাণী খ্রীষ্টানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বহুকাল থেকেই তার জীবনির উপরে চলে এসেছে নানা বিতর্ক। কেনোনা শুধু বাইবেলে নয়, বাইবেল ছাড়াও বিভিন্ন ভারতীয় প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যের মধ্যেও এমন এক ব্যক্তিত্বের আভাষ রয়েছে, যাকে বিভিন্ন গবেষকরা যীশু খ্রীষ্ট হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এই কিংবদন্তি মতে যীশু খ্রীষ্ট তার হারিয়ে যাওয়া সময় অন্তরালে ভারতে এসেছিলেন। এমনকি হিন্দু ধর্মের বিশেষ গ্রন্থ "ভবিষ্য পুরাণ' এতেও রয়েছে এমন এক ব্যক্তির উল্লেখ যাকে অনেক শাস্ত্রবিদেরা যীশু খ্রীষ্ট হিসাবে মনে করেন।

এমন কি লেখা রয়েছে এই পুরাণে, যার জন্যে এত বিতর্ক? সে বিতর্কে না হয় পরে আসছি। আগে জানা প্রয়োজন "পুরাণ' কি? 

ভবিষ্য পুরাণ

 "পুরাণ' তার অর্থ পুরানো, যা অতীতের সাথে সম্পর্কিত। এযাবৎ হিন্দু ধর্মে আঠারোটি মহাপুরাণ এবং আঠারোটি উপ পুরাণ রয়েছে, যেগুলি হল-

 ব্রহ্ম পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ,বায়ু পুরাণ, ভাগবত পুরাণ, নারদ পুরাণ, মার্কন্ডেয় পুরাণ, অগ্নি পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, লিঙ্গ পুরাণ, ভরহা পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ, ভামনা পুরাণ, কূর্মা পুরাণ, মৎস্যা পুরাণ, গরুড় পুরাণ, ব্রহ্মান্ডা পুরাণ। এছাড়া উপ পুরাণগুলির নামগুলি হল: সনাত-কুমার, নরসিংহ, বৃহন্নারদীয়, শিব-রহস্য, দুর্বাসা, কপিল, ভামনা, ভর্গব, বরুণ, কালিকা, শম্ভা, নন্দী, সূর্য, পারাশর, বসিষ্ঠ, গণেশ, মুদ্গলা এবং হংস।

সকল পুরাণ গুলির মধ্যে ভবিষ্য পুরাণ কিছুটা ব্যতিক্রম। সকল পুরাণ গুলি বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্মীয় দেবতার কাহিনী, চিকিৎসা, ব্যাকরণ, ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু ভবিষ্য পুরাণ উপরোক্ত অল্প কিছু বিষয় খানিকটা আলোচনার পাশাপাশি আনুমানিক আন্দাজে ভবিষ্যতে কি হতে চলেছে বা ভবিষ্যতের রুপরেখা নিয়ে আলোচনা করে। এই ভবিষ্য পুরাণ ব্যাসদেব দ্বারা প্রথম শতকের শেষ দিকে রচিত বলেই অনেকে মনে করেন। তবে হিন্দু ধর্মের বৃহৎ অংশের অনুসারী আরো প্রাচীন কালে লিখিত বলেই মনে করেন।

 যীশু খ্রীষ্টের বিষয়ে ভবিষ্য পুরাণ

ভবিষ্যপুরাণের উনিশ অধ্যায়ের চতুরয়ূগা খন্ডে, কিংবদন্তি রাজা শালিবাহন, যিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মতে প্রতিষ্ঠানে রাজত্ব করতেন এবং যিনি ছিলেন পরমার রাজ রাজা ভোজের পূর্বপুরুষ। এই শালিবাহন রাজার সাথে এক দিব্য পুরুষের পরিচয় এবং কথোপকোথন হয়, অনেকেই মনে করেন এই দিব্য পুরুষই হলেন প্রভু যীশু খ্রীষ্ট। যে কথোপকথনটি শুরু হয় উনিশ অধ্যায়ের চতুরয়ূগা খন্ডের তেইশ নম্বর শ্লোক থেকে।

বলা হয়েছে - 

কো ভারাম ইতিতাম প্রাহা

 সূ হবাচা মুদানভিতাহা

 ইশা পুত্রাম নাম ভিদ্দী

 কুমারীগর্ভা সম্ভাবাম

যার অর্থ - শালিবাহন রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে মহাশয়? উত্তরে তিনি বললেন আমি ইশাপু্ত্র, ঈশ্বরের সন্তান এবং আমি কুমারী মা থেকে জন্মগ্রহন করেছি।

Jesus Christ in Bhavishya Purana Hindu religion
হিন্দু যোগি রুপে যীশু খ্রীষ্ট (কল্পনায়)

যদি আমরা খ্রীষ্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের দেখি তবে আমরা দেখবো যে, যীশু খ্রীষ্ট নিজেকে বহু জায়গায় ঈশ্বরের সন্তান বলেই দাবি করেছেন, যার কয়েকটি উদাহরণ হল যোহন লিখিত- 

১০:৩০ - আমি ও পিতা এক।

১৪:৯ - যে কেউ আমাকে দেখে সে আমার পিতাকে দেখে।

এছাড়াও আরো বহু জায়গায় এমন উল্লেখ রয়েছে। আবার একি ভাবে বাইবেলের পুরানো নিয়মের ইশাইয়া লিখিত ৭:১৪ তে কুমারী মায়ের দ্বারা পুত্র সন্তান হবার ভবিষ্যৎ করা হয়েছিল, আর যার প্রমান স্বরুপ বাইবেলের নতুন নিয়মে মথি লিখিত প্রথম অধ্যায়ের ১৮-২৫ এ যীশুর মা মরিয়মকে কুমারী মা হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও লুক লিখিত প্রথম অধ্যায়ে যীশুর কুমারী মা দ্বারা প্রসবের বিবরণ পাওয়া যায়।

 আরো পরুন 👇

প্রভু যীশু খ্রীষ্ট কি ভারতে এসেছিলেন??

এছাড়াও ভবিষ্য পুরাণের ৩০ নং শ্লোকে যীশু খ্রীষ্ট তার ধর্ম প্রচার এবং যীশুকে মাশিহা কেনো বলা হয়েছে সে বিষয়ে বলেছেন - "হে পৃথিবী গ্রহের রক্ষক, পরম ভগবানের চিরন্তন পবিত্র ও শুভ রূপ আমার হৃদয়ে স্থাপন করে, আমি ম্লেচ্ছদের নিজস্ব বিশ্বাসের মাধ্যমে এই নীতিগুলি প্রচার করেছি এবং এইভাবে আমার নাম 'ইশা-মাসিহা' হয়েছে।"

 খ্রীষ্টানদের মধ্যে ভবিষ্য পুরাণের গ্রহনযোগ্যতা

এই প্রশ্নের এক কথার উত্তর খ্রীষ্টানদের মধ্যে পুরাণের এই শ্লোকগুলির গ্রহনযোগ্যতা একটুও নেই। যার পিছনে অনেক কারন রয়েছে , ক্যাথলিক, প্রোটেষ্টান সহ অন্য খ্রীষ্ট সম্প্রদায়ের বিশ্বাসীরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন পুরাণের উল্লেখিত ব্যাক্তি এবং তাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্ট একই ব্যাক্তি নন। কেনোনা বাইবেল হিসাবে সকল খ্রীষ্টানরা মনে‌ করেন যীশু খ্রীষ্ট মৃত্যু থেকে জীবিত হবার পর স্বর্গে উত্থিত হয়েছেন, এবং পুরাণের এই শ্লোকগুলি তার সমর্থন করে না।

দ্বিতীয়তঃ যে শালিবাহন রাজার সাথে এই কথোপকথন হয়েছে , ঐতিহাসিক মতে তার অস্তিত্ব ছিল আনুমানিক ৪৮-৫৮ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন , এবং এটি যদি সত্যি ধরে নেওয়া হয় তবে এটা ধরে নিতে হবে যে সেই মূহুর্তে রাজা কোনো পুরুষের সাথে নয় বরং তিনি কোনো এক বৃদ্ধের সাথে কথোপকথন করেছিলেন, কিন্তু শ্লোকে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে ২২ নং শ্লোকে - "হুনা দেশের মাঝখানে (হুনাদেশ - মনসা সরোবরের নিকটবর্তী এলাকা বা পশ্চিম তিব্বতের কৈলাস পর্বত) শক্তিশালী রাজা একজন শুভ পুরুষকে দেখতে পেলেন যিনি একটি পাহাড়ে বাস করছেন। লোকটির গায়ের রং ছিল সোনালী এবং তার পোশাক ছিল সাদা।‌‌" যা পরস্পর বিরোধী মতবাদ তৈরি করে। 

তৃতীয়তঃ যতগুলো পুরাণ রয়েছে, সেগুলো প্রায়শই একে অপরকে সমর্থন করে, এবং প্রতিটি পুরাণেই প্রতিফলিত হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে যীশুর বিষয়ে শুধুমাত্র একটি পুরাণেই বলা হয়েছে অন্যগুলিতে নয়।

চতুর্থতঃ এছাড়াও বর্তমানে আমরা যে পুরাণটি লক্ষ্যে করি তা কিছুটা বিকৃত অবস্থায় রয়েছে, এটি জানা যায় যে এই পাঠ্যের প্রায় ২০০ টি পৃষ্ঠা হারিয়ে গেছে বা ভুল স্থান পেয়েছে।

পঞ্চমতঃ ইসা নামটি তৎকালীন সময়ে বহুল প্রচলিত নাম হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে অনেকে মনে করেন। সুতরাং খ্রীষ্ট ধর্মের ইসা এবং পুরাণে বর্ণিত ইসা মে একই ব্যাক্তি তা সম্পূর্ণরূপে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।

ভারত ব্রিটিশ অধীনে থাকাকালীন যখন ভারতে ছাপাখানার ব্যবহার শুরু হয়, তখন ব্রিটিশ সাহায্য প্রাপ্ত খ্রীষ্টান মিশনারীরা ভারতে খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারের নানা ফন্দী আঁটতে থাকে। তাই অষ্টাদশ শতকের দিকে খ্রীষ্টান মিশনারীরা হিন্দুদের খ্রীষ্ট ধর্মের প্রতি আস্থা বাড়াতে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের (ভবিষ্য পুরাণ) অনুবাদ করে ছাপার সময় চতুরতার সাথে এই শ্লোকগুলি যুক্ত করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।

সুতরাং পুরাণ বর্ণিত সেই পুরুষ যে যীশু খ্রীষ্টই ছিলেন সেই বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়, যার ফলস্বরূপ খ্রীষ্টানরা পুরাণের এই শ্লোকগুলিকে মান্যতা দেয় না। 

(বিঃদ্রঃ - ভবিষ্য পুরাণের যীশুর সাথে শালিবাহনের কথোপকথনের সম্পূর্ণ শ্লোকগুলির বাংলা মানে পরের লেখায় তুলে ধরবো।)

শুক্রবার, ২৮ জুলাই, ২০২৩

সাপ কামড়ালে বেঁজীর বিষ লাগেনা ।। WHY MONGOOSE SERVIVE FROM SNAKE BITE ।।

জুলাই ২৮, ২০২৩

 

"দাঁ কুড়াল সম্পর্ক' "সাপ বেঁজীর সম্পর্ক ' এই দুটি একই প্রবাদ বহন করে। প্রচন্ড শক্তিশালী দুটি বিরোধী একে অপরকে শেষ করতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মঞ্চে উপস্থিত হয় একে অপরের সামনে এলেই। এক সময় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মোড়গ লড়াই, সাপ বেঁজীর লড়াই মানুষের কাছে বিনোদনের খোরাক যোগাত। একদিকে বিষধর সাপ অপরদিকে ক্ষীপ্র স্বভাবের নেউলে, যুদ্ধ চলে কোনো এক প্রতিদ্বন্দ্বির মৃত্যু পর্যন্ত।
বর্তমানে খুব অল্প কিছু প্রান্তে মোড়গ লড়াইয়ের অস্তিত্ব থাকলেও বাঁধ সেধেছে সাপ বেঁজীর লড়াইয়ে। ওয়াল্ড লাইফ প্রটেকশন এক্ট ১৯৭২ দ্বারা যা বন্ধ হয়ে পরে।
লড়াইগুলোতে সাপের দংশনে নেউলের কোনো প্রকার ক্ষতি হয়না। জনশ্রুতি আছে যে নেউলে বা বেঁজী বিষ প্রতিরোধের গোপন ভেষজের জানকারী রাখে। কিন্তু এটি একপ্রকার জনশ্রুতি, বাস্তবতা নয়। তাহলে বাস্তবতা কি, সাপ কামড়ালে বেজীর কেনো বিষ লাগেনা?
সাপের বিষে কি রয়েছে?
সাপের বিষে যেগুলি রয়েছে তার বেশিরভাগ রয়েছে প্রোটিনের যৌগ, কিছু ইনজাইম , এছাড়া বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগ, যেমন - জিংক সালফাইড, ক্যাটালেজ ইত্যাদি মিশ্রিত হয়ে জটিল রাসায়নিক যৌগ বিভিন্ন প্রকারের টক্সিক তৈরি করে।

সাপ বেঁজীI
এই সমস্ত টক্সিক সাপের প্রকারভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে, যা সাপের দংশনে ফ্যাং দ্বারা শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে এবং রক্তের সাথে বিক্রিয়া করে।  এছাড়াও সাপের লালাতেও জুটক্সিন থাকে যা শিকারকে অবসন্ন এবং হজম করতে সাহায্য করে। সাপের বিষ সরাসরি মাংসের সাথে বিক্রিয়া করতে পারে না। কিন্তু কোনো প্রকারে রক্তের সংস্পর্শে আসলেই খেল খতম।

বেঁজীর কেনো বিষ লাগেনা
শুধু বেঁজী নয়, ঘোড়ারও বিষ লাগেনা, তার কয়েকটি কারন আছে।
প্রথমতঃ বেঁজীর শরীর অতিরিক্ত লোমশ‌ প্রকৃতির হবার ফলে, সাপের পক্ষে দংশন করে বিষ দাঁত দ্বারা বিষ বেঁজীর শরীরের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হয় না।
দ্বিতীয়তঃ বেঁজী এবং সাপ একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বির রূপে দেখে থাকে, সুতরাং এই দুটি প্রজাতি সামনাসামনি এলে লড়াই অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, যেখানে নেউলে শিকারীর ভূমিকাই, এবং সাপ শিকারের ভূমিকাই থাকে, ফলে বেঁজীর ক্ষিপ্রতার সামনে সাপের দংশনের সাফল্য খুব নগণ্য হয়ে পরে।

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৩

মুন্ডা আদিবাসী জনসমাজ কেমন রয়েছেন।। MUNDA TRIBE COMMUNITY ।।

জুলাই ১৩, ২০২৩


ইতিহাসের পাতায় বিরসা মুন্ডার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, এমন এক বীর যোদ্ধা যেকিনা খ্রীষ্ট ধর্ম নিয়েছিল শিক্ষা পাওয়ার জন্যে, কিন্তু তার মনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা দমিয়ে রাখতে পারেনি ইংরেজরা, আদিবাসী জনসমাজের জন্য এগিয়ে আসেন। যার নামে ভারতের বুকে মুন্ডা আদিবাসীরা বিশেষ পরিচয় পেয়েছে। কারা এই মুন্ডা? কেমন এদের ভাষা, রীতিনীতি? কেমনই বা এদের আচার আচরণ, তা‌ ইতিহাসের পাতায় তেমন ঠাঁই পাইনি।
সমস্যা নেই, সেই দিকগুলো আজ তুলে ধরবো একদম সাধারণ ভাষায়।

মুন্ডা সম্প্রদায়েরা যুবকেরা

 জাতি পরিচয়

বর্তমানে বাংলাদেশ সহ ভারতের ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে এদের দেখা গেলেও, এদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঝাড়খন্ডে বেশি দেখা যায়। মুন্ডা দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় উপজাতি এবং জাতিতাত্ত্বিক দিক থেকে দ্রাবিড় উপজাতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন আদিবাসী সহবস্থানের কারনে কিছু কিছু অঞ্চলে দ্রাবিড় উপজাতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মী প্রোটো অষ্ট্রলয়েড মনে হয়। আবার এই সহবস্থানের কারনে মুন্ডাদের কিছু কিছু অঞ্চলে কোল নামে পরিচিত।

 ভাষা পরিচয়

মুন্ডারা যে ভাষায় কথা বলে, তার নাম মুন্ডারি বা মান্দারি। এটি অস্ট্রো- এশিয়াটিক ভাষা গোষ্ঠীর পাশাপাশি খেড়োয়াড়ী ভাষার অন্তর্গত। বিভিন্ন আদিবাসী ভাষা খেড়োয়াড়ী ভাষার মধ্যেই পরে। তবে বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে মুন্ডাদের ভাষা অন্য খেড়োয়াড়ী ভাষার সাথে মিশ্রিত হয়ে পড়ায়, স্থানভেদে মুন্ডাদের ভাষার তারতম্য দেখা যায়। যেহেতু এটি খেড়োয়াড়ী ভাষার অন্তর্গত,তাই‌ এই ভাষাটিও রোমান, দেবনাগরী বাংলা এবং উড়িয়ান লিপিতে লেখা হয়ে থাকে।

 জীবিকা
বিভিন্ন সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, মুন্ডা সম্প্রদায়েরা কৃষি ভিত্তিক সমাজের অংশ। আবার কারো কারো মতে মুন্ডাদের আদি জীবিকা পশু শিকার ছিল, যা কালক্রমে চাষবাসে পরিবর্তন হয়েছে। তবে বর্তমানে এরা চাষবাসের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মে নিজেকে নিযুক্ত করেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুন্ডাদের একটি বিশাল অংশ চা বাগানের সাথে যুক্ত, এবং এই চা বলয়যুক্ত অঞ্চলের বেশি ভাগ মুন্ডাদের মুন্ডারি ভাষা লোপ পেয়েছে।

 মালো আদিবাসী বিষয়ে কিছু কথা


বুধবার, ২১ জুন, ২০২৩

ভাষা হারানোর শঙ্কায় ওরাওঁ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। LANGUAGE OF ORAWN TRIBE COMMUNITYওরা ।।

জুন ২১, ২০২৩

ওরাওঁ পদবী যুক্ত ছেলেটি অনর্গল হিন্দীতে কথা বলেই চলেছে, বাড়ি উত্তরবঙ্গের পাহাড় ঘেঁষা সমতলে। আমি খুব একটা হিন্দীতে সাবলীল না, তাই যতটা পারি হিন্দীতে জিগ্যেস করলাম- আর কোন কোন ভাষা বলতে পারো? উত্তরে জানালো সাদরী। প্রশ্ন করলাম কুরুখ জানো না। ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে জানালো না। আমি এতদিন যা জানতাম ওরাঁও রা যে ভাষায় কথা বলেন, তার নাম কুরুখ ভাষা।

তার ঠাম্মার সাথে খানিকটা আলাপের সুযোগ হল, সে জানালো এই এলাকায় এখন গোনা কয়েকজন কুরুখ ভাষা বলতে পারে। আর এও জানালো যে তাদের প্রচলিত ভাষা কুরুখ এখন হারানোর মুখে।


 কুরুখ ভাষা


কুরুখ ভাষা দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত হলেও, এই ভাষার সাথে কঙ্কনি ভাষার অনেকটা মিল রয়েছে। এর পেছনে ভাষাবিদরা এবং নৃতাত্ত্বিকরা মনে করেন যে‌‌ কঙ্কন এলাকায় ওরাঁওদের আদি বাসস্থান ছিল, তার ফলে ভাষায় এই সংমিশ্রণ ঘটেছে। বর্তমানের নতুন প্রজন্মের ওরাওঁরা দুটি ভাষাকে আপন করে নিয়েছে একটি কুরুক অপরটি শাদরী। বর্তমানে শাদরী বহুল প্রচলিত। এ ভাষাটি দ্বারা শুধু বলা সম্ভব ছিল, কিন্তু লেখা সম্ভব ছিল না; কেননা এর বর্ণমালায় ছিল না । যার ফলে তাদের সাহিত্য এবং লোককথা মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে আসছিল যুগ যুগ ধরে, কিন্তু সমস্যার সমাধান করা গেছে তোরঙ লিপির সাহায্য। ডাক্তার নারায়ন ওঁরাও, একজন মেডিকেল ডাক্তার, কুরুখ ভাষার জন্য তোলং সিকি লিপি উদ্ভাবন করেছেন।

LANGUAGE OF ORAWN TRIBE COMMUNITY
ওঁরাও সম্প্রদায়

আবার হিন্দী ভাষার সাথে সাদরী ভাষায় কতিপয় মিল থাকার দরুন সাদরী ভাষাকে দেবনাগরী লেখন পদ্ধতিতে লৌখিক রুপ দেওয়া গেছে।


 সমস্যা কোথায়?


বলা বাহুল্য, যে ভাষার লোকসংখ্যার আধিক্য এবং লিপির প্রচলন রয়েছে, সেই ভাষার স্থায়িত্বও অনেক বেশি। মজার বিষয় হলো ২৩% ওঁরাও কুরুখ ভাষায় কথা বললেও ভাষাটিকে বিপন্নপ্রায় ভাষার তালিকাভূক্ত করা হয়েছে।

কেননা, সাদরী এবং কুরুখ ভাষার সহবস্থানে সাদরি ভাষার গ্রহনযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত বেশি। এখানে অনেকের প্রশ্ন হতে পারে, এতে সমস্যা কোথায়? 

সমস্যা রয়েছে, ভারতের ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তেও ওরাঁওদের বাসস্থান রয়েছে। কুরুখ ভাষার প্রাচুর্য থাকার দরুন ওরাঁওদের কুরুখ জাতিও বলা হত। বিশিষ্ট ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসক স্যার হারবার্ট হোপ রিসলে তার লিখিত পুস্তকে বর্ননা করেছেন ওরাওঁরা দ্রাবিড়ীয়ান (আবার কোথাও কোথাও প্রোটো অষ্ট্রলয়েড বলা হয়েছে) জ এওনগোষ্ঠীর লোক। তথাপি এদের ভাষাটি ও দ্রাবিড় গোত্রীয় ভাষা। সুতরাং সাদরী এবং কুরুখ এই দুটি ভাষার মধ্যে কোনটি প্রকৃত ভাষা, এতে দোটানায় ভোগে অনেকে। আবার এও দেখা গেছে যে যেসব স্থানে মুন্ডা, সান্থাল, ওরাওঁদের সহবস্থান রয়েছে, সেখানে কুরুখ ভাষার গ্রহনযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত অনেক কমেছে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০২৩

যীশু খ্রীষ্টের ভারতে আগমন কতটা সত্য? Did Jesus Christ visit India?

জুন ১৫, ২০২৩

 পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিচক্ষণ পন্ডিতেরা প্রভু যীশুর জীবনি এবং তার জীবনে‌ ঘটে যাওয়া জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল বিষয়ে গবেষণা করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। গবেষণা এবং পর্যালোচনা যেখানে রয়েছে সেখানে সমালোচনা তো থাকবেই। যীশুর বিয়ে, যীশুর পলায়ন, যীশুর ক্রুশে বলিদান সব কিছুতেই রয়েছে লাগামহীন তর্ক বিতর্ক। ঠিক একই ভাবে তর্কের সূত্রপাত দেখা দিয়েছে বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের (নতুন নিয়ম) সাইলেন্ট ইয়ার্স নিয়ে, সাইলেন্ট ইয়ার্স কি সেটিও হালকা করে জেনে রাখা ভালো - প্রভু যীশুর কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখার সময় প্রযন্ত বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে তেমন কিছু বলা হয়নি, মাঝখানের এই আঠারো বছর তিনি কোথায় ছিলেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। অনেক বিজ্ঞ সমাজ রয়েছে যারা মনে করেন এই সময়কালে তিনি ভারতে এসেছিলেন এবং প্রাচীন হিন্দু এবং বৌদ্ধ দর্শনের সংস্পর্শে এসে ধর্মিয় জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

থ্য এবং মতবাদ সমূহ

প্রভু যীশু নাকি ভারতের মাটিতে দু বার তার পদধূলি রেখেছেন, ক্রুশবিদ্ধ হবার আগে এবং ক্রুশবিদ্ধ হবার পরে। প্রথম বার মিশরের পথ ধরে ভারতে এসেছিলেন বৈদিক, বৌদ্ধ ও আয়ুর্বেদ শিক্ষার জন্য। তক্ষশীলাতে বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা সহ বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় শিক্ষাও লাভ ক‍রেন। কথিত আছে যে এই সময় তিনি গৌতম বুদ্ধের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ভারতে প্রাপ্ত এই সমস্ত ধর্মীয় জ্ঞান প্রভু যীশু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার পর প্রচারিত করেন। যার জন্যে প্রভু যীশুর প্রচারিত ধর্মে বৌদ্ধ ধর্মের অহিংসবাদী নিতী প্রকটভাবে রয়েছে।

দ্বিতীয় বার তবে কখন‌ আসেন? বলেছি তো ক্রুশবিদ্ধের পর, মুসলিমদের মতে যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যু ক্রুশবিদ্ধের সময় হয় নি অথবা‌ তিনি পুনরুজ্জীবিত হন নি, বরং তিনি কবর থেকে পালিয়েছেন। কবর থেকে বেরিয়ে কয়েকদিন তিনি লুকিয়ে বেরিয়েছেন এবং সুযোগ বুঝে তার শিষ্যদের সাথেও দেখা করেছেন। শরীরের ক্ষত সেরে উঠলে তিনি বিখ্যাত রেশম পথ হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন, এবং মৃত্যু পর্যন্ত ভারতেই থেকে যান।

আচ্ছা বকবকানি না, আমার কাছে প্রমাণ পেশ করতে হবে, বললেই মেনে নিতে হবে নাকি? প্রমাণ স্বরুপ কি কি তথ্য রয়েছে! 

আছে আছে, তথ্য আছে, একটি নয় কয়েকটি তথ্য, তবে তথ্যগুলো প্রমাণিত সত্য না।

Did Jesus Christ visit India kasmir tibbet
যীশু খ্রীষ্টকে নিয়ে নানা মতবাদ 

নিকোলাস নটোভিচের তথ্য 

নিকোলাস নটোভিচ নামে এক ব্যক্তি ১৮৯৪ সালে প্রভু যীশুর ১২ থেকে ৩০ বছরের যে সাইলেন্ট ইয়ার্স ছিল তার উপর ভিত্তি করে ফরাসি ভাষায় একটি বই লেখেন 'লা ভি ইনকনিউ দ্য জেসাস ক্রাইস্ট'। যদিও পরে এটি "আননোন লাইফ অফ যেসাস ক্রাইষ্ট" নামে বেশি পরিচয় লাভ করে। যেখানে তিনি লিখেছেন প্রভু যীশুর ভারতে পালিয়ে আসার কথা, এবং ভারতে প্রভু যীশুর দেহ ত্যাগের কথা।

নটোভিচ বিতর্কিত বই লিখেছেন, ভালো কথা কিন্তু কোন তথ্যর উপরে ভরসা করে লিখেছেন?

নটোভিচ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ দর্শনের উপরে গবেষণার উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যে ভারতের লাদাখের হেমিস মঠের লাইব্রেরি থেকে সেখানকার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সহায়তায় কিছু প্রাচীন তিব্বতিয় পান্ডুলিপির পাঠ উদ্ধার করেন, যেখানে ইসা (মুসলিমরা প্রভু যীশুকে ইসা নবী হিসাবে চেনেন) নামে এক পশ্চিমদেশীয় জ্ঞানী ধর্মীয় পুরুষের পরিচয় পাওয়া যায়। তিব্বতিয় সেই পান্ডুলিপির অনুবাদ করে তিনি পুনরায় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং বিতর্কিত বইটি লেখেন।

স্বামী অভেদানন্দ

একটি বই দ্বারা এটি কি করে প্রমানিত হল যে প্রভু যীশু ভারতে এসেছিলেন? 

না না একটি বই নয়, আরো রয়েছে স্বামী অভেদানন্দ, যিনি শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রম প্রতিষ্ঠাতা, নিজ চোঁখে সেই পান্ডুলিপি গুলো দেখেছিলেন এবং প্রভু যীশুর সেই রমস্যময় সময়ের বৃত্তান্ত স্বরুপ ‘কাশ্মীর ও তিব্বতে’ নামক একটি বই লেখেন। শুধু তাই নয় তিব্বতীয় সেই পান্ডুলিপির ২২৪ টি লাইন তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। প্রভু যীশু নাকি ভারতের তিব্বতে ছিলেন তাই নয়, তিনি এখানে মৃত্যুবরণ প্রযন্ত করেছেন। যার কবর এখনো বর্তমান।

এতবড় একটি যুগান্তকারী তথ্য, সেটি নিয়ে মাত্র দু জনেই গবেষণা করেছে? 

ধূর' তেমনটি নয়, এর আগেও অনেক গবেষক গবেষণা করেছেন সেই পান্ডুলিপি নিয়ে। যেমন- হেনরিয়েটা মেররিক ১৯২১ সালে পান্ডুলিপিটি দেখেন এবং "ইন দা ওয়ার্ল্ডেটিক" নামে বই লেখেন। আবার ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে মীর ইজ্জুৎউল্লাহ নামে একজন পারস্যবাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নির্দেশে মধ্য এশিয়া ও লাদাখ সফর করেন এবং তিনিও ওই পান্ডুলিপি গুলো দেখে "ট্রাভেলস ইন সেন্ট্রাল এশিয়া" নামের বই লিখেন।

আমার একটু আপত্তি আছে, এতক্ষণ যাদের কথা বললেন তারা সকলেই দেখছি শুধুমাত্র তিব্বতীয় পান্ডুলিপির উপর নির্ভর করে একি কথা বলে চলেছে, একটি পান্ডুলিপিকে তো আর প্রমান ধরা চলে না।

রাজতরঙ্গিনী

কলহন রচিত রাজতরঙ্গিনী, মনে করা হয় এটা ছাড়া নাকি কাশ্মিরের ইতিহাস জানা খুব মুশকিল। সেই গ্রন্থে ইসানা নামের এক দিব্য পুরুষের নাম পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে বলা হয়েছে “ইসানা নামক একজন মহৎ সন্ত ডাল হ্রদের তীরে ইসাবারে বসবাস করিতেন। তাঁহার অসংখ্য ভক্ত ছিল।” অনেকেই মনে করেন এই ইসানাই হলেন প্রভু যীশু খ্রীষ্ট। রাজতরঙ্গিনীতে বলা হয়েছে সন্ধিমতী নামক একজন জনতার দ্বারা রাজা নির্বাচিত হন, যিনি স্বয়ং ইসানার শিষ্য পাশাপাশি ইসানার ইচ্ছেতেই তিনি শিংহাষনে বসেন।

যীশু খ্রীষ্ট 

ও বাবা যীশুর উপরে এতগুলো লোকের প্রায় একই অভিমত, এবার একটু অবাক লাগছে।

এতটুকু জেনে যদি অবাক হয়ে গেলে? তাহলে আরো শোনো।

বৈশ্যমহাপুরাণ

"পুরাণ" হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের মধ্যে একটি।

হিন্দু ধর্মে মোট আঠারোটি পুরাণ রয়েছে, শিবপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ, ইত্যাদি। যাদের মধ্যে অন্যতম আরেকটি নাম “বৈশ্যমহাপুরাণ”। বৈশ্যমহাপুরাণে ইসা নামের এক জনের সাথে কাশ্মীরের রাজার কথোপকথন বিস্তারিত ভাবে লেখা আছে, তার থেকেও অবাক করার মত বিষয়টি হল বাইবেলে‌ যেমন প্রভু যীশুকে কুমারী মায়ের সন্তান বলা হয়েছে, তেমনি বৈশ্যমহাপুরাণে ইসাকে "কুমারীগর্ভস্বংবরণ" বলা হয়েছে।

আরো পড়ুন - ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচার কিভাবে শুরু হয় আর কে করেন প্রথম প্রচার?

আরো কিছু তথ্য

সবকিছু শুনলাম, জানলাম প্রভু যীশুর ভারতে আসার বিষয়ে এত কিছু তথ্য থাকা সত্ত্বেও খ্রীষ্টানরা কেন মেনে নেননি এই বিষয়টি?

মানা আর না মানা দুটোরই আলাদা আলাদা মুক্তি থেকে থাকে। কোন যুক্তি সঠিক, কোন যুক্তি বেঠিক সেটা কি বলা সম্ভব। প্রভু যীশুর ভারতে আসা নিয়ে আরো অনেক কথা রয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, যীশু কাশ্মীরে, আবার কেউ বলেন তিনি গৌতম বুদ্ধের প্রয়াণের শহর, কুশিনগরে মারা গিয়েছিলেন। আবার বাইবেল মতে তিনি রোমেই মারা গিয়েছেন। কাশ্মীরের যীশুর মৃত্যুর পর শ্রীনগরের কাছে প্রভু যীশুকে কবরস্থ করা হয়। কাশ্মীরের অধিবাসীরা একজন প্রাচীন হিব্রুভাষী ইহুদি পুণ্যবান পুরুষের কথা বলে আসছে, যার নাম উজ আসাফ। প্রভু যীশু নিজেও হিব্রু ভাষাতেই কথা বলতেন। তাই অনেকের ধারণা তিনিই যীশু খ্রীষ্ট ছিলেন।

খ্রীষ্টানদের এই মতবাদ না মানার কারন

এবার বিচার করো, কোনটিকে সঠিক মনে করবে?

সত্যিই তো? এক জনের বিষয়ে এত বিভিন্ন রকমের মতবাদ।

শুধু তাই নয়, আরো অনেকে আছেন যারা আরো ভিন্ন মত দিয়েছেন। যেমন মধ্যযুগীয় শেষের দিকের আর্থারিয়ান কিংবদন্তি অনুযায়ী যুবক যীশু ব্রিটেনে গিয়েছিলেন।

তাহলে প্রশ্নটা আবার একি জায়গাই গিয়ে ঠেকছে, যীশু ভারতে এসেছিলেন নাকি ব্রিটেনে?

আসলে বিষয়টি হল বিখ্যাত লোকেদের জীবনি নিয়ে নানা গুঞ্জন উঠতেই থাকে, তার উপরে যীশু খ্রীষ্ট এমন একজন ছিলেন যার প্রচারিত মতবাদ বিশ্বের সবথেকে বেশি মানুষ মেনে চলে, তার বিষয়ে গুঞ্জন ওঠাটাই স্বাভাবিক, তাই কি না।

 আরো পড়ুন - হিন্দু পুরাণে যীশু খ্রীষ্টের বিষয়ে কি বলা হয়েছে।

যেই তথ্যগুলো নিয়ে এতক্ষণ কথা বললাম সেগুলোতে একটি কথা পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, প্রভু যীশু কিশোর অবস্থায় মাত্র বারো বছর বয়সে ভারতে এসেছিলেন, অবাক করার মত বিষয়টি হল ভারত থেকে ইজরায়েল কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, তাছাড়াও সেই সময় আধুনিক সময়ের মত যানবাহন চলাচলের জন্য ছিল না, এক কিশোরের পক্ষে কি এতটা দূরত্ব পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব ছিল কি? যেখানে ভাষা ছিল প্রকৃত প্রতিবন্ধকতা।

হুম, যুক্তিটা বেশ জোরদার।

আবার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যাচাই করি, তবে ঐতিহাসিকরা এখনো প্রমান করতে পারিনি যে সেই সময়ে কাশ্মিরে এমন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল যেখানে হিন্দু এবং বৌদ্ধ দুটোই চর্চা করা হতো। পরবর্তী সময়ে তক্ষশীলাতে বৌদ্ধ ধর্ম চর্চা শুরু হলেও, দুটো সময়ের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।

তাছাড়াও ইজরায়েলের সমাজ মতে পিতার কাছ থেকে পুত্ররা তার কাজ শিখত। প্রভু যীশুর পিতা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি, সুতরাং প্রভু যীশু নিজেও সেই কাজ শিখেছিলেন, যার জন্যে সমাজে তার পরিচয় ছিল কাঠমিস্ত্রি হিসেবেই, যদি প্রভু যীশু কিশোর কালেই ভারতে আসতেন তবে তার দ্বারা কাঠমিস্ত্রির কাজ শেখা সম্ভব ছিল না, এই বিষয়ে বাইবেলের মার্ক লিখিত ৬ অধ্যায়ের ৩ নং পংক্তিতে বলা হয়েছে - এ তো সেই ছুতোর মিস্ত্রি এবং মরিয়মের ছেলে;।

এছাড়াও বহু বিষয় রয়েছে, যা পরস্পর বিরোধী অর্থডক্স তৈরি করে। সর্বোপরি পান্ডুলিপি এবং অন্যান্য গ্রন্থে ইসা নামের প্রাচুর্য পাওয়া যায়, তারপরেও এটা জানা সম্ভব হয়নি যীশু আর ইশা আসলে একই মানুষ।

মঙ্গলবার, ১৩ জুন, ২০২৩

ভারতে মালো আদিবাসী কারা ? মালোদের বিষয়ে কিছু তথ্য। INDIAN TRIBE COMMUNITY MALO ।

জুন ১৩, ২০২৩


মালো আর মালপাহাড়ির, কখনও বা মালো ওঁরাও আবার খুবই কিঞ্চিৎ পরিমানে এই তিনটির স্থান‌ বেশে সহবস্থান তাদের জাতি গত পরিচয়ে অনেকেরই কাছে ভুলভ্রান্তির সৃষ্টি করে থাকে, কেননা চরিত্র গত, রুচি গত, ব্যবহার গত এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংষ্কৃতি গত মেলবন্ধন থাকার ফলে এমনটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে জনমানবে।
আদিবাসী মালোরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তথা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে খুবই অল্প সংখ্যায় ছরিয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, ফলস্বরূপ মালোদের মধ্যে সংষ্কৃতিক উন্নয়ন থমকে রয়েছে বললেই চলে।
ব্রিটিশ ভারতে চায়ের বাগান তথা রেলপথ স্থাপনে দক্ষ কর্মীর চাহিদা পূরণ করার সুবাদে আদিবাসী মালোরা পূর্ব তথা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।

জাতিগত পরিচয়

ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচি এলাকায় এদের অবস্থান ছিল এবং কালক্রমে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। মালোরা দ্রাবিড়ীয়ান‌ জাতি গোষ্ঠীর হবার সুবাদে , দ্রাবিড়ীয়ান‌ অন্য জাতিবর্গের সাথে মিল পাওয়া যায়। মালো এবং অন্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মিল থাকার দরুন মালোরা প্রায়শই আত্ম পরিচয় হীনতায় ভুগে থাকেন। যার ফলস্বরূপ কিছু কিছু মালোরা তাদের পরিচয় অক্ষত রাখতে "মালো" শব্দটিকেই টাইটেল হিসেবে ব্যবহার করে। তবে এছাড়াও মালোরা  নায়েক, রাজ, শিং, সরকার, মন্ডল, ভূঁঞা পদবীকে টাইটেল হিসেবে ব্যবহার করেন।

INDIAN TRIBE COMMUNITY MALO
মালো মহিলা 


ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের জীবিকা তাদের পরিচয় বহন করে, যেমন কারো পেশা মধু সংগ্রহ, আবার কারো বাঁশের বিভিন্ন দ্রব্যাদী তৈরি, কিন্তু মালোদের বিষয়ে সঠিক ভাবে বলা না গেলেও মনে করা হয় তাদের প্রধান জীবিকা ছিল মাছ ধরা। তবে বর্তমানে এদের বেশিরভাগই চাষবাসকে প্রধান জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে (এর অর্থ এই নয় যে এরা অন্য কাজ করে না।)।

মালোদের ইতিহাস

মালোরা বরাবরই শান্তিপ্রিয় জাতি, তথাপি ঝাড়খন্ড প্রদেশ থেকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়ার সুবাদে তাদের মৎস্য শিকারের জায়গা থেকে সরে পড়লে, মালোরা চাষবাসের কাজে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের লাগামহীন কর এবং অত্যাচারে এরাও কৃষক বিদ্রোহী গুলিতে শামিল হয়। এই সময় বৃটিশ সরকারের হয়ে কর ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতো জমিদাররা, কিন্তু কৃষক বিদ্রোহে কৃষকদের পরাজয় কালক্রমেই মালোদের জমিদারের আশ্রিত প্রজাতে পরিণত করে। এইভাবে মালোরা কখনো জমিদারের ঘোড়ার, কখনও জমিদারের লাঠিয়াল, কখনও গোবাদি পশুর দেখভাল, ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে তাদের একপ্রকার স্বকীয়তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

সমাজ ব্যবস্থা
রিজলে, বুচানান প্রমূখ তাদের আদিবাসী বিষয়ক পুস্তকে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে কিছু তথ্য প্রদান করেছেন, যা কালক্রমে বিভিন্ন স্থানে পরিবর্তন হয়েছে, তাদের মতে মালোরা সাদরি ভাষায় কথা বলে, তবে স্থান ভেদে বিভিন্ন স্থানে বাংলা অপভ্রংশ, অথবা হিন্দি অপভ্রংশ (বাংলা এবং হিন্দি মিশ্রিত দ্রাবিড় গোত্রীয় ভাষা) ব্যবহার করে থাকে। রিজলে তার‌ পুস্তকে বর্ননা করেছেন - অন্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মত মালোদেরও সমাজে মাঝিহারাম (মোড়ল) দ্বারাই সমাজ ব্যবস্থা  পরিচালিত হয়। এবং মাঝিহারামকে সহযোগিতা করতে আরো বিশেষ দুটি পদ পারমানিক ও গুরদিক রয়েছে।

আরো পড়ুন - বোকা আদিবাসী চালাক হও সময় হয়েছে পরিবর্তনের।।


পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পিতার পরেই বড় ভাইয়ের কাঁধে দায়িত্ব তুলে দেন মালোরা। মালোদের প্রকৃত ধর্ম বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা না গেলেও, বর্তমানে মালোদের মধ্যে হিন্দু ধর্মের আধিক্য দেখা যায়, তবে হিন্দু ধর্মে মালোদের নিম্নবর্গের মনে করা হয়, যার ফলে মালোদের বেশ কিছু অংশ বিশেষতঃ বাংলাদেশে তাদের মধ্যে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রতি আকর্ষণ দেখা গেছে। অন্য ভারতীয়দের মত এরাও ভাত, সব্জী, মাংস হিসেবে মুরগি, ছাগল, শূয়োরের মাংস খেয়ে থাকে, তবে যারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী তারা শূকর খান না। উৎসবের আয়োজনে হাড়িয়া প্রধান পানীয় হয়ে ওঠে।

 মালোদের বিষয়ে কিছু কথা

একসময় মালোদের স্বকীয়তা ছিল হয়তো, আমার মতে তা হারিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত, কারন হিসেবে বলা যেতে পারে অশিক্ষা, নিজস্বতার প্রতি ওয়াকিবহাল না থাকা ইত্যাদি। প্রথমেই মনে করিয়ে দিই যে মালোরা এমন একটি জাতি যারা আত্মপরিচয়ের অভাবে ভুগছে, পাশাপাশি শিং, মন্ডল, সরকার ইত্যাদি পদবী গুলোকে ব্যবহার করাই তাদের প্রকৃত পরিচয় নষ্ট হচ্ছে। আবার ইতিহাস বলছে জমিদারের আমলে তারা ঘাসী, বুনি হিসেবে পরিচয় পেয়েছিল, যা তাদের গানেও বর্তমান ‘রাঁচি থেকে আসলো ঘাসী, তারপর হলো আদিবাসী।’ এই সমস্ত বিষয়গুলো থেকে অনুমেয় যে তারা তাদের পরিচয় রক্ষার্থে খুব একটা সচেষ্ট নন, তার ফলস্বরুপ তারা আদিবাসী অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পাশাপাশি অশিক্ষা তাদের অগ্রগতিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আবার স্বল্প বয়সে বিয়ে এদের মধ্যে খুব দেখা যায় ফলে অপরিপক্ক অবস্থায় পিতা মাতায় পরিনত হওয়া মালোরা আগামী প্রজন্মকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারে না। বর্তমানে বাংলা ভাষাকে প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করলেও যেখানে অন্য আদিবাসীদের সহবস্থান দেখা যায় সেখানে মালোরা সেই ভাষাকেই আপন ভাষা হিসেবে করায়ত্ত করে ফেলে, উদাহরণ স্বরূপ পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় মালোদের সংখ্যা তুলনামূলক অন্য সকল রাজ্য থেকে বেশি, তবে ওঁরাওদের সাথে সহবস্থান মালোদের ভাষাকে সাদড়ী ভাষায় পরিনত করেছে। যা একপ্রকার ভাষা গ্রাস বলা যেতে পারে।

শনিবার, ১০ জুন, ২০২৩

ভারতে খ্রীষ্ট বা খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচার সাধু থোমা যেভাবে শুরু করেন। How Christianity began in India । The reason why Saint Thomas came to India।

জুন ১০, ২০২৩

 ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রসারের ইতিহাস ও সময়কাল বিষয়ে ভারতের জনমানুষের শিংহভাগের মধ্যে ভূল মতামত জায়গা করে নিয়েছে। বস্তুত ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচার প্রায় দু হাজার বছর আগেই শুরু হয়েছে। তিব্বতীয় কিছু পান্ডুলিপিকে প্রমাণ ধরে কিছু বৌদ্ধ পন্ডিত এও দাবি করেন যে ভারতে স্বয়ং যীশু খ্রীষ্ট এসেছিলেন এবং গৌতম বুদ্ধের কাছ হতে প্রচুর জ্ঞান প্রাপ্ত করেছিলেন। বস্তুত খ্রীষ্টানদের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেলে যীশু খ্রীষ্টের জীবনের কয়েকটি বছরের, বিশেষ করে যুবক কালের কয়েক বছরের ইতিহাস জানা যায়নি, কথিত আছে যে সেই সময়ে তিনি ভারতে এসেছিলেন এবং বেদ জ্ঞানের অধ্যায়ন এবং বৌদ্ধ দর্শনের অধ্যায়ন করেছেন। যদিও বা‌ আজকের আলোচ্য বিষয় ভারতে প্রভু যীশুর আগমন নিয়ে না, ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচার নিয়ে।

ভারতে খ্রীষ্ট বা খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচার সাধু থোমা যেভাবে শুরু করেন। How Christianity began in India । The reason why Saint Thomas came to India।
সেন্ট থমাস ক্যাথেড্রালে রাখা সেন্ট থমাস হত্যার প্রতিকৃতি 

স্বাভাবিক ভাবেই ভারতীয়দের মধ্যে এই ভূল ধারনা রয়েছে যে, ফ্রান্স এবং ব্রিটিশদের দ্বারাই ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচারের ইতিহাস দুই হাজার বছর পুরোনো, এবং ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের পথিকৃৎ সাধু থোমার সেই কর্মকান্ডকে স্মরণে রেখে ১৯৬৪ সালে ভারতের ডাক ও টেলিগ্রাফ বিভাগ দ্বারা প্রেরিত থোমার নামে ডাকটিকিট ও স্ট্যাম্প তৈরী করা হয়েছিল। 

 ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচার 

বাইবেল মতে যীশু খ্রীষ্টের স্বর্গারোহণের আগে তার বারো জন শিষ্যদের গোটা বিশ্বে খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচার করতে বলেন, আর এই খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন তার এক শিষ্য পিতর (ইংরাজিতে পিটার)। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে যীশু খ্রিস্টের আরেক শিষ্য থোমাকে নিয়োজিত করেন। পবিত্র আত্মায় দিক্ষীত থোমা বর্তমানের ইজরায়েলের জেরুশালেম থেকে আকাবার উপসাগর এরপর লোহিত সাগর হয়ে আরব সাগরের পথে দক্ষিণ ভারতে ৫২ খ্রীষ্টাব্দে মালাবার উপকূলে প্রবেশ করেছিলেন। 

ভারতে প্রবেশ করার পর থেকেই তিনি এখানকার বেশ কিছু পরিবারকে পবিত্র আত্মার নামে তাদের খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করতে থাকেন। এই বিষয়ে কথিত আছে যে তিনি প্রভু যীশুর নামে বিভিন্ন রোগিদের সুস্থতা প্রদান করতে এবং যীশুর নামে বদ আত্মাদের মানুষের মধ্যে থেকে বিতাড়িত করতে পারতেন, যার ফলশ্রুতিতে তার দ্বারা‌ প্রচারিত খ্রীষ্ট ধর্মে মানুষের আস্থা বাড়তে থাকে। এইভাবে থোমা পাকালোমাত্তোম, সংকরপুরি, থইয়িল, পাইপ্যাপিলি, কল্লী, কালিয়ানঙ্কাল এবং পাতামুক্কু নামক কয়েকটি পরিবারকে বাপ্তিস্ম প্রদানের দ্বারা খ্রীষ্ট ধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রতি আকর্ষিত হয়ে কিছু রাজা যেমন গন্ডোনিফার্স খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতে কিছু রাজা খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করলে, থোমার দ্বারা সেই স্থানের কোডুঙ্গল্লুর, পলয়ূর, কোট্টাক্কাভু (পরাভুর), কোকামঙ্গালাম, নীরনাম, নীলকল (ছায়াল), কোল্লাম এবং তিরুভিথামকোডে খ্রীষ্ট ধর্মের উপাসনা স্থল বা গীর্জা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়ে ওঠে।

ভারতে খ্রীষ্ট বা খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচার সাধু থোমা যেভাবে শুরু করেন। How Christianity began in India । The reason why Saint Thomas came to India।
সেন্ট থমাস ক্যাথেড্রাল চেন্নাই 

সাধু থোমার মৃত্যু 

দক্ষিণ ভারতের মাটিতে থোমা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচার করলে খ্রীষ্ট ধর্ম বিস্তার লাভ শুরু করে, তার প্রচারিত খ্রীষ্ট ধর্মের প্রতি মানুষের আকর্ষন বৃদ্ধি পেতে থাকলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে ভিতীর কারন হয়ে পড়ে। এমনাবস্থায় তামিলনাডুর ময়লাপুরে ধর্ম প্রচারের পর সাধু থোমা আত্মগোপনে প্রার্থনা করা কালিন বর্শা দ্বারা তাকে হত্যা করা হয়, এবং এখনো তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের সেইন্ট থমাস ক্যাথেড্রাল ব্যাসিলিকা বা স্যান্ট থোমাস চার্চে।


 আরো পড়ুন - ভারতে খ্রীষ্টানদের উপর অত্যাচার কতটা সত্য এবং কারা দায়ী?

শুক্রবার, ৯ জুন, ২০২৩

ভারতের নতুন শিক্ষা ব্যাবস্থায় কি পরিবর্তন হয়েছে? What has changed in India's new education system?

জুন ০৯, ২০২৩

" সব শিক্ষাই ভিক্ষার শিক্ষা, নাচে ঘ্যামটা ঘুমটা খোলে ......................... হবি তো কেরানী নাকে চশমা খুঁজে।" নচিকেতার গানের এই কয়েকটি লাইনের যথার্থ কতখানি, বলা মুশকিল, কিন্তু ২০২৩ এ যে নতুন শিক্ষানিতী এসেছে তাতে নচিকেতার এই গানটি যথার্থ হারাতে চলেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অঢেল পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রকের নাম বদলে, হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রক। তার সাথে থাকছে প্রচুর পদক্ষেপ। সুতরাং বলাই যেতে পারে শুধু কেরানি তৈরি করা নয়, প্রকৃত শিক্ষায় গুরুত্বের পাশাপাশি গুরুত্ব ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিজ্ঞানমনস্ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে। অন্যদিকে নতুন শিক্ষানীতির খসড়া প্রকাশ হবার সাথে সাথে বিরোধী দলগুলো নতুন শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে উগরে দিচ্ছেন তাদের ক্ষোভ। তাদের মতে এই নতুন শিক্ষানীতির পরিনতিতে ক্ষতি হবে ছাত্রছাত্রীদের।

ভারতের নতুন শিক্ষা ব্যাবস্থায় কি পরিবর্তন হয়েছে? What has changed in India's new education system?
নতুন শিক্ষানীতি ভারতকে কোন পথে নিয়ে যাবে? সেটাই দেখার

ব্যক্তিগত মতামতের আঙ্গিকে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি নতুন প্রজন্মের জন্য ভালো না খারাপ বলা কঠিন।

 ক্লাস ৬ থেকেই ভোকেশনাল ট্রেনিং।

সব কিছু চুরি যেতে পারে, শুধু হাতের কাজ না। বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা এর আগে প্রতিষ্ঠিত ছিল না, এমনটা বলা বোধহয় বোকামি হতে পারে। তবে তা ছিল ঐচ্ছিক এবং একটি নির্দিষ্ট সময় এবং বিভিন্ন যোজনার দ্বারাই এই বিষয়টির দেখাশোনা করা হতো। কিন্তু এখন থেকে আর তেমনটি থাকছে না ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে বৃত্তিমূলক শিক্ষা। ফলে যে সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা চাকরির বাইরে অন্য কিছু করতে চাই,  অথবা যে সব ছাত্র ছাত্রী প্রথাগত লেখাপড়ায় তেমন পারদর্শী নয় তাদের সুযোগ থাকবে এই ভোকেশনাল ট্রেনিং দ্বারা নিজেদের ভবিষ্যত গড়ে তোলার, এবং সব ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেই তা গ্রহণযোগ্য। ধরা যাক, কেউ ইলেক্ট্রিকের কাজ অথবা মোটর ভিহিকেলের কাজ শিখতে চাই তবে সে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই শিখতে পারে।

থাকছে না বিজ্ঞান ও কলা‌ পার্থক্য

হয়তো আর কোনো গৃহ শিক্ষক শিক্ষিকাকে শুনতে হবেনা -" আমি অংক ভালো বুঝি, কিন্তু রসায়ন আমার মাথায় একটুও ঢুকে না।" অথবা অন্য কিছু, এখন সেই বেড়াজাল ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে
বিজ্ঞান পড়লেই কলা বিভাগের সাবজেক্ট নিতে পারবেনা, সে ব্যাপারটা আর থাকছে না। ছাত্রছাত্রীরা তার পছন্দমতো বিষয়সমূহ , অন্য ভাবে বলতে গেলে তাদের যে সমস্ত বিষয়গুলো জানতে পড়তে ভালো লাগে ( তা বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের বা যেকোনো বিভাগের হোক না কেনো।) তবে সে তা নিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ একজন ছাত্র রসায়ন নিয়ে পড়ার সাথে সাথে ইতিহাস নিয়েও পড়তে পারে। সুতরাং এখন আলাদা করে বিজ্ঞান, কলা‌, বানিজ্য থাকছে না।

ভাংতে চলেছে পুরোনো প্রথা

এমনিতেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক গুরুত্ব কমে গিয়েছিল, কিন্তু এবার তার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে, কেননা ১০+২ উঠে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় রয়েছে নজরকাড়া বহুল পরিবর্তন। প্রাথমিক স্তরে চার বছরের মডেল রুপান্তরিত ৫ বছরে, আর এই স্তরেই জোর দেওয়া হয়েছে মাতৃভাষা শিক্ষার উপর। এরপর তিন বছর অষ্টম প্রযন্ত মাতৃভাষার শিক্ষা ঐচ্ছিক বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম সাবজেক্টিভ বিষয়গুলোকে অহেতুক সম্প্রসারিত সিলেবাস থেকে সরিয়ে পাঠের পয়েন্ট টু পয়েন্ট আলোচনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই ছাত্রছাত্রীরা চাইলে কম্পিউটার কোডিং শিখতে পারবে। এরপর নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত এই চার বছর উচ্চ বুনিয়াদি শিক্ষার উপরে জোর দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পুর্বের ১০+২ ব্যাবস্থা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয়টি হল পরবর্তী উচ্চ শিক্ষা (Graduation) মডেল, কেন তা পরে আলোচনা করছি। এখানেও পূর্বের তিন বছরের মডেল সরিয়ে চার বছরের গ্রাজুয়েশন করা হয়েছে। আগে তিন বছরের শিক্ষা শেষে উচ্চ শিক্ষার (Graduation) মর্যাদা পেত, তবে তা পরিবর্তন করে প্রথম বছর শেষে সার্টিফিকেট, দ্বিতীয় বছর শেষে ডিপ্লোমা, তৃতীয় বছরে ব্যাচেলার, এভাবে চতুর্থ বছরের ব্যাচেলর উইথ রিসার্চ শেষে সরাসরি পিএইচডি করার সুযোগ থাকছে।এর আগে স্নাতকোত্তরে ৭৫ শতাংশের বেশি নম্বর না হলে পিএইচডি করা যেত না, এখন তা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি এর মধ্যবর্তী এম ফিল উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের নতুন শিক্ষা ব্যাবস্থায় কি পরিবর্তন হয়েছে? What has changed in India's new education system?
পুরোনো শিক্ষা থেকে মুক্তি


সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপ

শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন নামেও পরিবর্তন এনে দিয়েছে, কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রকের নাম বদলে, হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রক। শিক্ষাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সরকারের জিডিপি তে হস্তক্ষেপ করতো তা আন্দাজ করা কঠিন ছিল না। বর্তমানে জিডিপির ১.৭% শিক্ষাক্ষেত্রে খরচ করা হলেও, জিডিপির ৬% শিক্ষাখাতে এখন থেকে খরচ করা হবে। ল এবং মেডিক্যাল ছাড়া বাকি সরকারি হোক বা বেসরকারি সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন রেগুলেশন চালু হবে। সকলেই শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পারে বিশেষ করে মেয়েদের ১৮ বছর পর্যন্ত শিক্ষার অধিকার মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করবে। ভারতের দূর্গম এলাকায় যাতে শিক্ষা পৌঁছতে পারে সেই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে অনলাইন লার্নিংয়ে জোর দিচ্ছে কেন্দ্র সরকার, আপাতত ৮টি ভাষায় আপাতত অনলাইনে পড়াশোনা চলবে।
শুধু তাই নয় বিশ্বের প্রথম সারির ১০০ টা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতে ক‍্যাম্পাস খোলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে পদক্ষেপ সরকারের ১০০% স্বাক্ষর পূরণের দিকেই রয়েছে বলা যেতে পারে, তবে সিলেবাসের কিছু পরিবর্তন সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন রেখে যাই।